


ঢাবির ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট ইলিয়াস আল মামুনের গত সোমবার (১৭ আগস্ট) শিক্ষার্থী ইব্রাহিমকে হল অফিসে ডেকে নিয়ে তার সাথে করা কার্যকলাপের ফুটেজ দেখে মর্মাহত হয়ে ভিক্টিম ইব্রাহিমের বন্ধু আবির হাসান ফেসবুকে এক দীর্ঘ পোস্ট করেছেন।
আবির হাসান লেখেন, যে ভয়ংকর ভিডিও আমি নিজ চোখে দেখেছি সেটা জাতির সামনে উন্মোচিত করা উচিত যাতে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা এ রকম অমানুষের মতো আচরণ করতে না পারে।
এনপিবি নিউজের পাঠকদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী ভিক্টিম ইব্রাহিমের বন্ধু আবির হাসানের পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
আবির হাসান ফেসবুক পোস্টে লেখেন-
মাত্র প্রক্টর অফিসে সিসিটিভি ফুটেজ দেখলাম। একজন শিক্ষক কি পরিমাণ ভয়ংকর হইতে পারে সেটা চাক্ষুষ দেখলাম আজকে।
১৭ আগস্ট ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট ইলিয়াস আল মামুন আমার বন্ধু ইব্রাহিমকে হল অফিসে ডেকে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। কারণ সে ফেইসবুকে প্রভোস্টকে সমালোচনা করে একটা পোস্ট করেছিল।
১২.৩৮ মিনিটে ইব্রাহিমকে হল অফিসে ডেকে নিয়ে আসা হয়। রুমে ঢোকার সাথে সাথেই প্রভোস্ট ইব্রাহিমকে ধমকাধামকি শুরু করে, প্রচণ্ড উচ্চস্বরে চিল্লাচিল্লি করে। তাকে একজন অপরাধীর মতো দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। বসতে না দিয়ে ধমকাধামকির পরে ১২.৪২ মিনিটে প্রভোস্ট ইব্রাহিমের ফোন সিট থেকে উঠে এসে ছিনায়ে নেয়ার চেষ্টা করে।
এই মুহূর্তে ইব্রাহিম রুম থেকে বের হতে চাইলে প্রভোস্ট এক দৌড়ে দরজার সামনে যেয়ে ইব্রাহিমের পথ আটকায়ে হল অফিসের সমস্ত স্টাফকে (১২ জন) ডেকে নিয়ে আসেন। তারপরে তিনি নিজে ইব্রাহিমকে ধাক্কা দিয়ে টেবিলের একপাশে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ হাতাহাতি করে ইব্রাহিমের হাত থেকে ফোন কেড়ে নেয়। এইটা মনে রাইখেন একজন হল প্রভোস্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিজে একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জোরপূর্বক তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়েছে।
একজন স্ট্যাফ রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়। এই পুরা সময়জুড়েই প্রভোস্ট কন্টিনিউয়াসলি ইব্রাহিমকে ধমকাধামকি করে যাচ্ছেন। আর প্রোভোস্ট ফোন কেড়ে নিয়ে হলের স্ট্যাফ মারুফের হাতে দিয়ে দেয়।
দুপুর ১.০৪ এর সময় ইব্রাহিমের বাসায় কল দেয় হলের একজন স্টাফ। ইব্রাহিমের অসুস্থ মাকে ফোন দেওয়া হয়। এই সময় প্রভোস্ট হলের একজন স্টাফকে একটা স্টেটমেন্ট লিখে নিয়ে আসতে বলেন। বাসায় কল দেয়া হয়েছে জেনে ইব্রাহিম মাথায় হাত রেখে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়, প্রচণ্ডরকমভাবে ট্রমাটাইজড হয়ে যায়। ইব্রাহিমের কান্না থামানোর জন্য তাকে মিথ্যা বলা হয় যে বাসায় ফোন দেয়া হয় নাই। এই ফুটেজ আজকে প্রক্টর অফিসে দেখার সময় ইব্রাহিম আবারও আজকে কান্না করে দেয়।
১.১২ এর সময় একটা প্রিন্টেড স্টেটমেন্টটা ইব্রাহিমের হাতে দেওয়া হয়। ইব্রাহিমকে সেটা আবার হাতে লিখে জমা দিতে বলা হয়। প্রভোস্ট দাঁড়িয়ে থেকে নিজে বারবার ইব্রাহিমকে ইন্সট্রাকশন দিচ্ছিলো স্টেটমেন্টে কি কি লিখতে হবে। ইব্রাহিম স্টেটমেন্ট লেখার সময় হল স্টাফ মারুফ ইব্রাহিমের ছবি তুলে রাখে।
১.২০ এর সময় স্টেটমেন্টটা একজন স্ট্যাফ ইব্রাহিম এর থেকে নিয়ে প্রভোস্টের কাছে দেয়। সেইটা প্রভোস্টের মনমত না হওয়ায় আবার সেইটা ইব্রাহিমকে দেওয়া হয়। ইব্রাহিম আবার সেটা লিখে ১.২৫ টায় প্রভোস্টের কাছে জমা দেয়।
১.৩৯ টায় ফোনটা ইব্রাহিমের হাতে ফেরত দেওয়া হয়। এই পুরা এক ঘণ্টা ইব্রাহিমের ফোনটা হলের স্টাফ মারুফের হাতে ছিল। পাক্কা এক ঘণ্টা ইব্রাহিমকে অশ্রাব্য ভাষায় উচ্চস্বরে ধমকাধামকি করে হলের প্রভোস্ট।
এতক্ষণ পর্যন্ত ইব্রাহিম জানতো না যে তার বাসায় ফোন দেওয়া হয়েছে, ফোন হাতে নিয়ে ইব্রাহিম জানতে পারে যে তার বাসায় ফোন দেওয়া হয়েছে। এমন সময় কান্নাকাটি করলে প্রভোস্টকে একটু ভড়কে যান। তাই ইব্রাহিমকে পানি খাইতে দেওয়া হয়। পানি হাতে ইব্রাহিমের হাত কাঁপছিলো, পানি খেতে পারছিল না। ডিবি হারুনের ভাতের হোটেলে নির্যাতন করার মতো ইব্রাহিমকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে তাকে খাবার খেতে বলা হয়।
১.৪৫ টায় হলের একজন স্টাফ ইব্রাহিমের বাসায় ফোন দিয়ে বোঝায় যে কিছু হয় নাই এখানে সমস্যা নাই। প্রভোস্ট ইব্রাহিমকে ফেইসবুকে তাকে প্রশংসা করে একটা পোস্ট লিখতে বলেন। হল অফিসে ঘটে যাওয়া ঘটনা বাইরে শেয়ার করলে, ইব্রাহিমের ছাত্রত্ব বাতিল করবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। প্রভোস্টের প্রশংসা করে পোস্ট লিখব আর কোন সমালোচনা করবো না এবং হল অফিসে ঘটে যাওয়া ঘটনা কাউকে শেয়ার করবো না এই মর্মে ইব্রাহিমকে ১.৫৫ মিনিটে হল অফিস থেকে ছেড়ে দেয়া হয়।
১ ঘন্টা ১৭ মিনিট ইব্রাহিমকে হল অফিসের প্রভোস্ট রুমে আটকে রাখা হয়। পুরা সময়জুড়ে প্রভোস্টের আচরণ ছিল প্রচণ্ড উগ্র। ইব্রাহিমকে হলের সিট বাতিল, ছাত্রত্ব বাতিল এবং সাইবার মামলার হুমকি দেওয়া হয়।
সিসিটিভি ফুটেজ দেখার পর প্রক্টর স্যারের উপস্থিতিতে ফজলুল হক মুসলিম হলের ভিপি আবু নাঈম জানান যে, তদন্ত চলাকালীন সময়ে প্রভোস্ট মামুনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে এবং নতুন প্রভোস্ট দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত প্রভোস্টের কক্ষে তালা থাকবে; এটিই সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি।
ঠিক সেই মুহূর্তে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব, হাউজ টিউটর ও হলের কোষাধ্যক্ষ আল আমিন শিকদার (যিনি প্রভোস্টের নিজ বিভাগের শিক্ষক) উদ্দেশ্য করে হুমকির সুরে বলেন, ‘নাঈম, ভিডিও শুধু এটাই না, বাকিগুলোও তদন্ত হবে, সব দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ তার এই মন্তব্যের উদ্দেশ্য হয়তো তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা। এমন পক্ষপাতমূলক ও হুমকিমূলক আচরণের পর আল আমিন শিকদার হাউজ টিউটর কিংবা নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের নৈতিক অধিকার রাখে কিনা, এটা একটা প্রশ্ন।
যে ভয়ংকর ভিডিও আমি নিজ চোখে দেখেছি সেটা জাতির সামনে উন্মোচিত করা উচিত যাতে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা এরকম অমানুষের মতো আচরণ করতে না পারে।
আবির হাসান সিএসই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ভিক্টিম ইব্রাহিমের বন্ধু।