

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ও হল ছাত্র সংসদের নির্বাচন-২০২৫ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ২৫শ সেপ্টেম্বর। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের গণতন্ত্র ও নেতৃত্ব চর্চার এ প্ল্যাটফর্মটির হাত ধরে অতীতে অসংখ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে যারা জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১৯৮৯ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রয়েছে রাকসু নির্বাচন। ছত্রিশে জুলাই ২০২৪, ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবী হয়ে উঠে ছাত্রসংসদ নির্বাচন। যার ফলশ্রুতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের পর এবার ছাত্র সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের এ প্রধান বিদ্যাপীঠে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারীসহ গোটা বিশ্ববিদ্যালয় কমিউনিটি এবং দেশবাসী আগ্রহের সাথে তাকিয়ে আছে কারা নির্বাচিত হবে শিক্ষার্থীদের ভোটে এবং কেমন নেতৃত্ব আসবে রাকসুতে।
ডাকসু-জাকসুর মতই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যেও এটাই জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক চর্চার আনুষ্ঠানিক সুযোগ পেয়ে ভোটাররা কিভাবে আচরণ করছে, তাদের প্রত্যাশা কি, প্রার্থীদের কাছে তারা কি প্রত্যাশা করে, তাদের ক্যাম্পাস জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, তাদের পছন্দ-অপছন্দ, এবং ভোটিং বিহেভিয়র জানতে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক মানবাধিকার গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সংস্থা "সোচ্চার-টর্চার ওয়াচডগ বাংলাদেশ"-এর পক্ষ থেকে এই জরিপটি পরিচালনা করা হয়।
জরিপের সময়কাল: ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০২৫। ছাত্রসংগঠনগুলো রাকসু নির্বাচনে প্রার্থিতা ও প্যানেল ঘোষণার পরে এ সার্ভে করা হয়েছে।
সর্বমোট অংশগ্রহণকারী: ১২৮৪ জন (৪০.৪% নারী শিক্ষার্থী)। হলভিত্তিক স্ট্র্যাটিফায়েড স্যাম্পল নেয়া হয়েছে।
ধর্ম ও এথনিসিটি: অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে ৮৬.৮% মুসলিম, ১৩.২% অমুসলিম। ২.৩% ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এবং ৯৭.৭% বাঙালি। ৩৩% শিক্ষার্থী তাদের বাহ্যিক বেশভূষায় ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক চিহ্ন (দাঁড়ি-টুপি, হিজাব, সিঁদুর ইত্যাদি) ধারণ করেন।
আবাসিক-অনাবাসিক স্ট্যাটাস: অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫৯.৩% আবাসিক শিক্ষার্থী, ৪০.৭% অনাবাসিক যার মধ্যে ৭% নিজের বাসায় বসবাস করে এবং ৩৩.৭% মেস/হোস্টেল বা সাবলেটে থাকেন।
শিক্ষাবর্ষ: প্রথম বর্ষ (৮.৬%), দ্বিতীয় বর্ষ (২০.৯%), তৃতীয় বর্ষ (২৭.২%), চতুর্থ বর্ষ (২০.৬%), ও মাস্টার্স (২২.৭%)।
এসএসসি পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরণ: অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৮৮.৯% জেনারেল হাইস্কুল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা, ১০.৪% মাদ্রাসা, এবং ০.৬% ইংলিশ মিডিয়াম। নারীদের মধ্যে ৯৪% জেনারেল হাইস্কুল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা।
এসএসসি পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থান: পুরুষদের মধ্যে ৫৪% এবং নারীদের মধ্যে ৪১.৮% এসএসসি পর্যায়ের পড়াশোনা গ্রামের প্রতিষ্ঠানে করেছেন। বাকিরা জেলা শহর বা বিভাগীয় শহরে পড়েছেন।
খন্ডকালীন চাকুরি: ৪১.২% পুরুষ ও ২৫.২% নারী শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি খন্ডকালীন চাকুরি করেন।
১) জরিপে মোট অংশগ্রহনকারী ১২৮৪ জন। অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে ৪০.৪% নারী, ১৩.২% অমুসলিম, ২.৩% ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর (অবাঙালি) শিক্ষার্থী।
২) ৭৯.৬% শিক্ষার্থী রাকসুতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ছাত্রীদের মধ্যে এর হার ৬৯.৪%, ছাত্রদের মধ্যে ৮৬.৫%।
৩) ৮৫.৭% শিক্ষার্থী মনে করেন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। ৫৫.৭% শিক্ষার্থী মনে করেন রাকসু নির্বাচনে ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব পড়বে।
৪) ৪০.৫% শিক্ষার্থীর পছন্দ এমন প্যানেল যেখানে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র অ্যাক্টিভিস্টদের সমন্বয় আছে। ৫) প্যানেল নয়, যোগ্য প্রার্থী দেখে ভোট দিবে ৮২.৩% ভোটার। ৭৭.৪% শিক্ষার্থী বলেছেন, ব্যক্তিগত পরিচয় বা দল মূখ্য নয়, তারা ভোট দিবেন যোগ্য প্রার্থীকে।
৬) ৭৮% শিক্ষার্থী বলেছেন ভোটদানের ক্ষেত্রে প্রার্থীর জেন্ডার বিবেচ্য নয়। ১৯.৬% ভোটার পুরুষ প্রার্থীদের প্রাধান্য দিবেন।
৭) নেতা হওয়ার জন্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়া জরুরী বলে মত দিয়েছেন ৫২.৬% অংশগ্রহনকারী। পুরুষ ভোটারদের চেয়ে নারী ভোটাররা নেতৃত্বের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়াকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
৮) ৫৬.১% ভোটাররা প্রাধান্য দিবেন যে প্রার্থীরা ব্যক্তিজীবনে একইসাথে অ্যাকাডেমিক্যালি ও অ্যাক্টিভিজমে ভালো সমন্বয় করতে পারেন।
৯) ২১.৬% শিক্ষার্থী নিজে শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্যাম্পাসে নির্যাতিত হয়েছেন বলে প্রকাশ করেছেন। ছেলেরা নির্যাতিত হয়েছেন মেয়েদের চেয়ে বেশি। ২৪.৬% ছেলেরা নির্যাতিত হয়েছেন, যেখানে মেয়েরা নির্যাতিত হয়েছেন ১৭%।
১০) ৪৩.১% শিক্ষার্থী অন্যকে নির্যাতিত হতে দেখেছেন। পুরুষদের মধ্যে এর পরিমাণ ৫১%।
১১) ৫৪.৮% শিক্ষার্থী মনে করেন রাকসু'র নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ক্যাম্পাসকে নির্যাতনমুক্ত করতে পারবেন।
১২) রাকসু প্রতিনিধিদের কাছে শিক্ষার্থীদের কয়েকটি মৌলিক চাওয়া হচ্ছে: আবাসন সমস্যার সমাধান, খাবারের মান উন্নয়ন, নির্যাতন ও সহিংসতামুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাস, অ্যাকাডেমিক পরিবেশ উন্নতকরণ, এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক প্রতিনিধিত্ব যেখানে দলের উর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীরা প্রাধান্য পাবে।
১৩) ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে যে যে প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রাধান্য দিবে: ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়া, সততা, ভালো সংগঠক, ধার্মিক, গুড সেন্স অব হিউমার, প্রগতিশীল, ভালো শিক্ষার্থী, ভালো বক্তা, এবং জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা।
মন্তব্য করুন