


আবাসনবিহীন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাসা থেকে বের হয়ে অনেকসময় জানতে পারেন, নষ্ট হওয়ায় আজ বাস আসবে না। তখন ক্লাস ধরতে তড়িঘড়ি করে অন্য যানবাহনে ছুটতে হয়। আবার অনেক সময় যাত্রাপথে বিকল হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস। ফলে মাঝপথে নেমে বিকল্প উপায়ে গন্তব্যে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের।
বাসগুলোর ভেতরের অবস্থাও করুণ। কোথাও ফ্যান নেই, কোথাও জানালার কাচ ভাঙা। বৃষ্টির সময় পানি ঢুকে সিট ভিজে যায়। নড়বড়ে সিটে নেই কাভার, ঠিকভাবে বসাও যায় না। দোতলা বাসগুলোর বেশির ভাগের ওপরের তলায় ওঠার সিঁড়ি ও হাতল ভাঙা। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যাতায়াতে ব্যবহৃত বিআরটিসি পরিচালিত বাসগুলোর অধিকাংশেরই ফিটনেস নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন এসব বাসে চলাচল করছেন শিক্ষার্থীরা।
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, ফিটনেস সনদবিহীন বা মেয়াদোত্তীর্ণ সনদ ব্যবহার করে কোনো মোটরযান সড়কে চলাচল করতে পারে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে চলাচলরত বিআরটিসি বাসগুলোর বেশির ভাগের ফিটনেস সনদের মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যাতায়াতের জন্য বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাস ও মাইক্রো রয়েছে ৪৩টি। এসব যানবাহনের মেরামত খরচ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করা হয়। মাসে এ খাতে ব্যয় হয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। প্রশাসনের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সকল যানবাহনের ফিটনেসসহ প্রয়োজনীয় লাইসেন্স রয়েছে।
অন্যদিকে বিআরটিসির ১২টি বাস পরিচালনায় মাসে ব্যয় হয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। দিন, কিলোমিটার ও আসনসংখ্যা হিসাব করে বিআরটিসিকে অর্থ পরিশোধ করা হয়। এসব বাসের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্বও বিআরটিসি ডিপোর।
প্রশাসন জানিয়েছে, কল্যাণপুর ডিপো থেকে বাস নেওয়ায় খরচ বেশি হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে মতিঝিল ডিপো থেকে বাস নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তুলনামূলক ভালো অবস্থার বাস পাওয়া যায় এবং ব্যয়ও কমে।
সরেজমিনে কয়েকটি বাস ঘুরে দেখা যায়, অনেক বাসের দরজায় হাতল নেই। অনেক বাসের দোতলায় ওঠার সিঁড়ির হাতল ভাঙা। সিটের ওপর থাকা বেশির ভাগ ফ্যান বিকল। সিটের কাভার নেই এবং অধিকাংশ সিটই নড়বড়ে। হাত দিয়ে টান দিলেই পুরো সিট সরে যায়। কোথাও কোথাও সিট থেকে পেরেক বের হয়ে আছে, আবার গেটের অংশে বেরিয়ে আছে ধারালো লোহা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, বাসগুলোতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী বহন করা হয়। এতে প্রায়ই ঝুঁকি নিয়ে ঝুলে যাতায়াত করতে হয় অনেককে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসগুলোতেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
মিরপুর রুটে চলাচলকারী ‘অনির্বাণ’ বাসের এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমাদের রুটের বাসগুলোর কন্ডিশন খুব খারাপ। বেশ কয়েকটা বাসে পর্যাপ্ত ফ্যান নেই। মাঝেমধ্যেই ফ্লাইওভারে উঠতে গিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তায় ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। বেশির ভাগ বাসের জানালার গ্লাস ভাঙা, সিট ভাঙা। সিটের অনেক জায়গায় পেরেক বের হয়ে আছে। গেটের বিভিন্ন স্থানে কাঁটা লোহা বের হয়ে আছে। ব্রেক কষলেই অনেক সময় শিক্ষার্থীরা পড়ে যান। অনেক বাসের দোতলায় ওঠার সিঁড়ি ও হাতলও ভাঙা।”
‘কালিগঙ্গা’ বাসের ১৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শ্রীকান্ত বলেন, “অনেক দিন যাবৎ একটি ফ্যান নষ্ট। তার ওপর আসন সংখ্যার চেয়ে শিক্ষার্থী বেশি থাকে। গরমে অনেক অসুবিধা হয়। আমাদের বাসের ফ্যানটি দ্রুত ঠিক করা প্রয়োজন।”
‘প্রজন্ম-২’ বাসে যাতায়াত করা ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শফিকুল ইসলাম বলেন, “২১ ব্যাচ আসার পর থেকে বাসে জায়গা পাওয়াই মুশকিল হয়ে গেছে। অনেককেই ঝুলে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বাসগুলোর ফিটনেসও নেই বললেই চলে। প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন মোট ১০৮টি ট্রিপ পরিচালিত হয়। এপ্রিল মাসে ২১ দিন বাস চলাচল করেছে। এছাড়া অতিরিক্ত চারটি বাস রিজার্ভ রাখা হয়, যেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়।
জ্বালানি ব্যবহারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাস প্রতি লিটার জ্বালানিতে প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। টাটা বাস চলে প্রতি লিটারে ২.৫ কিলোমিটার এবং মাইক্রোবাস চলে প্রায় ৩.৫ কিলোমিটার।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী চালক রয়েছেন ১৯ জন এবং বাকি চালকরা চুক্তিভিত্তিক। স্থায়ী হেলপার রয়েছেন ৬ জন, যাদের মধ্যে কয়েকজন চালকের দায়িত্বও পালন করেন। এছাড়া একজন চুক্তিভিত্তিক হেলপার রয়েছেন। স্থায়ী চালকদের সরকারি গ্রেড স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক চালকদের মাসিক বেতন প্রায় ২৪ হাজার টাকা।
‘দুর্জয়’ বাসের এক চালক বলেন, “সামান্য কিছু ত্রুটি আছে। ওভারলোডের কারণে এমন ক্ষতি হয়। রাস্তায় অতিরিক্ত চাপের কারণেও সমস্যা তৈরি হয়। গাড়ির সংকট আছে। ফ্যান নষ্ট আছে, তবে দ্রুত ঠিক করা হবে।”
জকসুর পরিবহন সম্পাদক মাহিদ খান বলেন, “ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারণে আমরাও পরিবহন খাতে ভুক্তভোগী। আমরা কল্যাণপুর ডিপো থেকে বাস পরিবর্তন করে তুলনামূলক ভালো বাস আনার চেষ্টা করছি। ২০১৯ সালের পর বিআরটিসিতে নতুন কোনো বাস না আসায় বিষয়টি কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে বিকল্প ডিপো থেকে বাস নেওয়ার বিষয়ে আমরা কাজ করছি।”
এ বিষয়ে পরিবহন প্রশাসক ড. তারিক বিন আতিক বলেন, “বিগত সময়ের তুলনায় এখন আমরা পরিবহন খাতে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ করার চেষ্টা করছি। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেগুলো মেনেই আমরা সামনে এগোচ্ছি। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি গাড়ি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।”
তবে বিআরটিসি বাসের ফিটনেস প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।"