শুক্রবার
২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘আমার সোনার পুতুল ছেলে, আমার জন্য বাঁচি থাকুক’

এনপিবিনিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:৩৭ পিএম আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:৪৪ পিএম
আহত নাইমুল ইসলাম রাফি
expand
আহত নাইমুল ইসলাম রাফি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর আহত শিক্ষার্থী নাইমুল ইসলাম রাফির জন্য বুকভরা আর্তনাদ তার মা রেহানা আক্তারের।

চোখ ভেজা, কণ্ঠ কাঁপা—“আমার ছেলে হয়তো আর স্বাভাবিকভাবে খেতে বা কাজ করতে পারবে না, তারপরও সে যেন বাঁচে। আমার জন্য সে যেন বেঁচে থাকে।”

রাফি চবির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের ছাত্র। বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। বাবা মফিজুল ইসলাম কাতারে চাকরি করেন, মা রেহানা আক্তার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের শিক্ষক। তিন বোনের ভাই রাফি দ্বিতীয় সন্তান, সবার আদরের।

গত শনিবার রাতে ক্যাম্পাসের এক নারী শিক্ষার্থীকে নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনার জেরে পরদিন রবিবার দুপুরে নতুন করে সংঘর্ষ বাঁধে। সেই সময় সন্ত্রাসীদের রামদার কোপে মারাত্মকভাবে আহত হন রাফি। হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত, ডান হাতের কনুই প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

দ্রুত ঢাকায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে গিয়ে রক্তনালীর অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আপাতত তিনি বিপদমুক্ত, তবে সুস্থ হতে সময় লাগবে; বিশেষ করে ডান হাতে আর স্বাভাবিকভাবে কাজ করার আশা কম।

হাসপাতালের বাইরে বসে কাঁদতে কাঁদতে রাফির মা বলেন, “সকালে ও ঘুম থেকে উঠে খেতে বের হয়েছিল, পরে শুনি সংঘর্ষে দুজন ছাত্র আহত—ও নাকি তাদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে নিজেই আক্রান্ত হয়।”

কথার ফাঁকে উঠে আসে আরও কষ্টের স্মৃতি—“মাথায় কতগুলো আঘাত লেগেছে কেউ বলছে ছয়টা, কেউ বলছে দুইটা। হাত, পা, পিঠ—পুরো শরীর জখম। আগেও একবার হাত ভেঙেছিল, এবার সেই হাতটাই আবার বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।”

রাফির মা বলেন, ডাক্তাররা আশার কথা বললেও কর্মক্ষম থাকা নিয়ে শঙ্কা আছে। “ছেলেকে দিয়ে কোনো পরিশ্রমের কাজ করানো যাবে না, হাতের কাজ লাগে এমন চাকরি তো নয়ই।”

ছোটবেলা থেকেই রাফি ছিল শান্ত, শিষ্ট ও দায়িত্ববান। মায়ের ভাষায়—“বাড়িতে কোনো আড্ডা না, চাচাতো ভাইদের সাথে হাসিমুখে সালাম দিয়ে কথা বলত, দোকানে বসত না, টাকা জমিয়ে রাখত—বাবার কষ্টের কথা ভেবে।”

নামাজ পড়া, রমজানে তাহাজ্জুদে জাগা—সবই ছিল তার নিয়মিত অভ্যাস। চাকরিতে ঘুষ না দেওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্তের কথাও পরিবার জানত। ব্যবসার পরিকল্পনাও ছিল মনে।

“আমার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। ওকে মানুষ করার, পড়ানোর স্বপ্ন। কিন্তু আজ ওর এই অবস্থা দেখে শুধু আল্লাহর কাছে বিচার চাই,”—কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন রেহানা আক্তার।

ছেলের ওপর হামলার পরও কোনো মামলা করতে চান না তিনি। তার ভাষায়, “আমি কারও বিরুদ্ধে মামলা করব না। আখিরাতের আদালতে বিচার চাইব। সেদিনই জানতে চাইব আমার ছেলের দোষ কী ছিল।”

রাফিকে আহত অবস্থায় যিনি উদ্ধার করেন, সেই চবির ছাত্র আহমেদ জুনাইদ বলেন, “ওকে যখন ধরি, পুরো শরীর রক্তে ভিজে যাচ্ছিল। মাথা, হাত, পা—সব জায়গায় কোপের দাগ। ও তখন শুধু হাঁপাচ্ছিল।”

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংঘর্ষে আহতদের চিকিৎসার পূর্ণ ব্যয় তারা বহন করবে। প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “ঢাকায় পাঠানো শিক্ষার্থীর খরচও আমরা দিচ্ছি। বাইরে যদি কেউ চিকিৎসা খরচ করে থাকে, সেটিও ফেরত দেওয়া হবে।”

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন