

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহীদ জসিম উদ্দীনের কন্যা দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় পটুয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল তিন কিশোর আসামিকে দুই ধারায় ৩৬ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন।
আজ বুধবার দুপুরে (২২ অক্টোবর) ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিলুফা শিরিন সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে আসামিদের উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা দেন। রায় ঘোষণার পর আসামিদের জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতের নির্দেশে সাজাপ্রাপ্ত কিশোর আসামিদের যশোর শিশু সংশোধনাগারে পাঠানো হবে।
রায়ে মো. সাকিব মুন্সী, সিফাত মুন্সী ও ইমরান মুন্সী এই তিন কিশোরকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ অপরাধে ১০ বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এছাড়া পর্নোগ্রাফি আইনে সাকিব ও সিফাতকে আরও তিন বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আব্দুল্লাহ আল নোমান। সে দিন কি হয়েছিল শহীদ কন্যার সাথে: গত ১৮ মার্চ দুমকি উপজেলার পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নে শায়িত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত বাবা শহীদ জসিম উদ্দীনের কবর জিয়ারত করে একই উপজলার আলগী গ্রামে নানা বাড়িতে যাওয়ার পথে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন কলেজছাত্রী লামিয়া।
ঘটনার পরের দিন দুমকি থানায় গিয়ে তরুণী অভিযোগ করেন। রাতেই মামলা রুজু হয়। মামলায় সাকিব মুন্সি (১৭) এবং সিফাত মুন্সি (১৫) নাম উল্লেখ করা হয়।
গত ৬ মে আদালতে পুলিশের জমা দেয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ভুক্তভোগী কলেজছাত্রী তার ‘ঘনিষ্ঠ’ সহপাঠী ইমরান মুন্সী (১৭) মাধ্যমে প্রথমে ধর্ষণের শিকার হয়। ওই ঘটনা দেখে তা ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অভিযুক্ত অন্য দুই কিশোর সাকিব মুন্সি (১৭) ও সিফাত মুন্সী (১৫) ভুক্তভোগীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। পাশাপাশি মুঠোফোনে ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে ফাঁসের হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বলা হয়।
ধর্ষণের ভিডিও, এক আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও জব্দ করা আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষায় দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
আত্মহত্যা ও লামিয়ার শেষ চিঠি: ডায়েরিতে লামিয়া লিখেছেন,‘আমার জীবনের ছোট একটি স্বপ্ন হলো নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। বাবা মারা গেছে ২৬ দিন। তার ভিতরেই দেখা যাইতেছে কে কত দূর ভালোবাসে। বাবা যতদিন ছিল ততদিন সবার কাছ থেকে আদর পাইছি। তাও খুব কম। আমার বাবায় মানুষকে খাওয়াইতে পারতো তখন তারা আমাদের প্রতি ভালোবাসা দেখাইতো।
আর এখন আমরা অসহায় দেইখা তারা আমাদের প্রতি অবহেলা করে। তাই আমি চাই নিজেকে এমন করে প্রতিষ্ঠিত করতে যেন যারা আজ অবহেলা করে তারা আমি প্রতিষ্ঠিত হবার পর আমাদের কাছে অনুতাপ প্রকাশ করে। নিজের জীবনের লক্ষ্য শুধু পরিবারকে নিয়ে। ভাই-বোন প্রতিষ্ঠিত করা, সম্পূর্ণ লেখাপড়া শেষ করা ও ভাইয়ের ভবিষ্যৎ গড়া।
ভাইকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। যেদিন এগুলো সব পূরণ করতে পারবো সেদিন থেকে আমার জীবন ভালো কাটবে। আব্বু দোয়া কইরো এগুলো যেন সব পূরণ করতে পারি। আম্মুকে সুখ দিতে পারি। আম্মুর সব দুঃখ যেন বুঝতে পারি। পরিবারকে নিয়ে সুখে থাকতে পারি।’
এরপরেই কলম দিয়ে বাবার ছবি এঁকেছেন লামিয়া। এভাবেই মনের ভেতর লুকিয়ে রাখা কথাগুলো বাবার কাছে বলতেন লামিয়া। এ ঘটনায় মামলা বিচারাধীন অবস্থায় শনিবার (২৬ এপ্রিল) রাত ৯ টায় রাজধানীর শেখেরটেক ৬ নম্বর রোডের বি/৭০ নম্বর ভাড়া বাসায় লামিয়া আক্তার আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার আগে লামিয়া তার ডায়েরিতে শেষ চিঠি লিখে গেছেন।
পুলিশের চোখ যা দেখছে: ঘটনার মূল হোতা হিসেবে ইমরান মুন্সির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে। যদিও এজাহারে তার নাম ছিল না, তবে পরবর্তীতে তদন্তে তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছেন পটুয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাজেদুল ইসলাম। তিনি বলেন ‘সম্ভবত ভুক্তভোগী তরুণী ইমরানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তাকে এড়িয়ে গিয়েছিল। তবে তদন্তে ইমরান মুন্সির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে।’
বাবার কবরের পাশে শায়িত লামিয়া: ঢাকা থেকে সন্ধ্যা সাত টায় দুমকি উপজেলার পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের রাজগঞ্জ গ্রামের লামিয়ার মরদেহ এসে পৌঁছায়। পরে পাঙ্গাশিয়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় লামিয়ার জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
শেষে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ জসিম উদ্দিনের কবরের পাশে শায়িত করা হয় লামিয়াকে। লামিয়ার মৃত্যুতে স্তব্ধ ছিল গোটা দেশ। জানাজায় অংশ নিয়ে ছিল, কেন্দ্রীয় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তর অঞ্চল) সারজিস আলম, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, সহ-সভাপতি মশিউর রহমান মামুন, জেলা বিএনপির আহবায়ক আব্দুর রশিদ চুন্নু মিয়া ও সদস্য সচিব স্নেহাংশু সরকার কুট্টি এবং পটুয়াখালী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আন নাহিয়ান।
পটুয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘গত ২৮ মে আদালতে চার্জ গঠন করে। এ মামলায় মোট ১৬ জনের স্বাক্ষী গ্রহন করে আদালত। আজ দীর্ঘ সাত মাস ৫দিনের মাথায় রাষ্ট্র এবং আসামি পক্ষের আইনজীবীর যুক্তিতর্ক শেষে আদালত আজ রায় দিয়েছেন। রাষ্টপক্ষ আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট’।
পিপি আরও বলেন,‘আসামিরা যেহেতু কিশোর বয়সের। তাই প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের শিশু সংশোধনাগারের রাখার নির্দেশনা দিয়েছে আদালত।
মন্তব্য করুন