

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সহজ অনলাইন শপিংয়ের সুযোগের আড়ালে দেশের অন্যতম বড় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম দারাজে ভয়ংকর সব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
মাদক বিক্রির অভিযোগে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এর মধ্যেই প্ল্যাটফর্মটিতে প্রকাশ্যে মাদক সেবনের সরঞ্জাম, অনিবন্ধিত যৌন উত্তেজক ওষুধ এবং নানা ধরনের সন্দেহজনক পণ্য বিক্রির তথ্য সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দারাজে বিভিন্ন নামে মাদক সেবনের অনুষঙ্গ এবং যৌন উত্তেজক পণ্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নজরদারি ও স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারিং ব্যবস্থাকে পাশ কাটাতে মাদক সেবনের কলকিকে কখনো মাটির বাঁশি বা অন্য সাধারণ পণ্যের নামে বিক্রি করা হচ্ছে।
একটি তালিকাভুক্ত পণ্যের নাম দেওয়া হয়েছে ‘Soil Flute Made by Pure Clay’, যার আড়ালে মাটির কলকি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। মাত্র ১৮৫ টাকায় তালিকাভুক্ত এই পণ্যের বিস্তারিত বিবরণীতে মাটির কলকির পাশাপাশি কাঠ ও শিং দিয়ে তৈরি পাইপসহ মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জামের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘এয়ার ফ্রেশনার’, ‘এসেনশিয়াল অয়েল’, সিবিডি অয়েল কিংবা অ্যারোমেটিক অয়েলের মতো পরিচয়ে তরল মাদক বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক অভিযানে অনলাইনে ক্রেতা সেজে অর্ডার দিয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকা মূল্যের ৬২০ মিলিলিটার তরল THC উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এক কেমিস্টকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিজিটাল মাধ্যমে মাদক বিক্রির অভিযোগে বাড্ডা থানায় মামলাও করা হয়েছে। মামলায় দারাজের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট বিক্রেতাদের আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করে বিপজ্জনক তরল মাদক বিক্রি করা হয়েছে।
শুধু মাদক নয়, দারাজে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনবিহীন বিভিন্ন যৌন উত্তেজক ওষুধ ও রাসায়নিক পণ্য বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। এসব পণ্যকে অনেক ক্ষেত্রে ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ বা ‘হারবাল প্রোডাক্ট’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন বা যথাযথ অনুমোদন যাচাই ছাড়াই এ ধরনের পণ্য বিক্রি হলে তা ভোক্তার জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ই-কমার্স খাতের নীতিমালা অনুযায়ী, থার্ড-পার্টি সেলারদের পণ্য তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই, নজরদারি এবং নিষিদ্ধ পণ্য শনাক্তে কার্যকর ফিল্টারিং ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু দারাজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো থেকে প্ল্যাটফর্মটির পণ্য যাচাই ও নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো অবৈধ পণ্য তৃতীয় পক্ষের বিক্রেতা তালিকাভুক্ত করলেই প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষ দায়মুক্ত হয়ে যায় না। পণ্য যাচাই, নিষিদ্ধ পণ্য শনাক্ত এবং অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে মাদক বা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে গাফিলতি গুরুতর আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে দারাজ বাংলাদেশ জানিয়েছে, পণ্যের নিরাপত্তা, প্রচলিত আইন মেনে চলা এবং গ্রাহকের আস্থাকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছ থেকে মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পণ্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং নীতিমালা অনুযায়ী বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের আরও কোনো পণ্য রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করতে নজরদারি ও যাচাই কার্যক্রম জোরদারের কথাও জানিয়েছে তারা।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এতদিন ধরে যদি মাদক সেবনের সরঞ্জাম, সন্দেহজনক যৌন উত্তেজক পণ্য কিংবা তরল মাদক সাধারণ পণ্যের আড়ালে তালিকাভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে প্ল্যাটফর্মের স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারিং ও বিক্রেতা যাচাই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল। অভিযোগের প্রকৃত চিত্র এবং দারাজের দায় কতটা, তা নির্ধারণে চলমান তদন্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


