

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে নাম-পরিচয়, চেহারা, জীবনযাপন—সবকিছু বদলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার নাকের নিচে থাকা একটি জন্মচিহ্ন এবং নিজের মুখে দেওয়া একটি পরিচয়ই ভেঙে দেয় চার দশকেরও বেশি সময়ের ছদ্মবেশ।
গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন আগে মোজাফফর নিজের আসল পরিচয় সম্পূর্ণ মুছে ফেলেন। নতুন নামে জীবন শুরু করেন, বদলে ফেলেন চেহারা, পোশাক ও চলাফেরার ধরন। পুরোনো পরিচিতজন, আত্মীয়স্বজন এবং অতীতের প্রায় সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন, যাতে কোনোভাবেই তার অবস্থান শনাক্ত করা না যায়। জীবনের শেষভাগে তিনি গোপনে দেশে ফিরে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসে বসবাস শুরু করেন। নিজেকে একজন অবসরপ্রাপ্ত, সাধারণ ও রাজনীতিবিমুখ বৃদ্ধ হিসেবে পরিচিত করে তুলেছিলেন।
ডিবির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, গোয়েন্দাদের কাছে আগে থেকেই মোজাফফরের একটি শারীরিক বৈশিষ্ট্যের তথ্য সংরক্ষিত ছিল। তার নাকের ঠিক নিচে একটি তিল বা আঁচিলসদৃশ কালো দাগ ছিল, যা জন্মগত হওয়ায় পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এ চিহ্নকেই শনাক্তকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে ধরে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
মেয়ের সূত্রে শুরু অনুসন্ধান
গোয়েন্দারা প্রথমে মোজাফফরের মেয়ের কর্মস্থলের সূত্র ধরে অনুসন্ধান শুরু করেন। জানা যায়, তিনি একটি বেসরকারি টেলিকম কোম্পানিতে চাকরি করেন। কয়েক মাস ধরে তার কর্মস্থল ও চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করে সম্ভাব্য একটি বাসার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর ওই বাসায় গোপনে নজরদারি চালিয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হয়, সেখানে সত্যিই মোজাফফর বসবাস করছেন কি না।
ছদ্মবেশে অভিযান
বুধবার (১৫ জুলাই) গভীর রাতে ডিবির একটি দল ছদ্মবেশে ওই বাসায় যায়। তারা নিজেদের টেলিকম প্রতিষ্ঠানের কর্মী পরিচয় দিয়ে দরজায় কড়া নাড়ে এবং মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে চায়।
এত রাতে অফিসের লোকজন আসায় বাসার ভেতর থেকে এক বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি বেরিয়ে এসে জানতে চান, কী প্রয়োজন।
কথোপকথনের একপর্যায়ে গোয়েন্দারা তাকে উদ্দেশ করে বলেন, “আমরা তো আপনাকে চিনি না, আপনি কে?”
জবাবে ওই ব্যক্তি বলেন, “আমি মোজাফফর। মেয়ের বাবা।”
এই উত্তর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গোয়েন্দারা নিশ্চিত হন, দীর্ঘদিন ধরে খোঁজা সেই ব্যক্তিই তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। এর আগেই অল্প আলোয় তার নাকের নিচের জন্মচিহ্নটি মিলিয়ে নিয়েছিলেন তারা। এরপর মুহূর্তের মধ্যেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
৪৫ বছরের পলাতক জীবন
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সংঘটিত হামলায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এ মামলায় ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের একজন ছিলেন মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন।
সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। পরে ভুয়া পরিচয়, জাল কাগজপত্র এবং ছদ্মনাম ব্যবহার করে বছরের পর বছর আত্মগোপনে থাকেন। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, তিনি ভুয়া নথির মাধ্যমে বিদেশ ভ্রমণও করেছেন। ফলে ইন্টারপোল ও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দীর্ঘদিন তার অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি।
তবে শেষ পর্যন্ত নাকের নিচে থাকা একটি জন্মচিহ্ন এবং নিজের মুখে দেওয়া পরিচয়ই ভেঙে দেয় ৪৫ বছরের সেই ছদ্মবেশ। দীর্ঘদিনের পলাতক জীবন শেষ হয় বনানী ডিওএইচএসে ডিবির অভিযানের মধ্য দিয়ে।