

জীবনসঙ্গীর পাপে আজ আমার জীবন নিষ্পেষিত। বাবা-মায়ের কথা মেনে সোহেলকে বিয়ে না করলে হয়তো এমন খেসারত দিতে হতো না। জেনেশুনে একজন মাদকাসক্তকে বিয়ে করার এমন করুণ পরিণতিও হয়তো ভোগ করতে হতো না।
এমন আক্ষেপ করেন কনডেম সেলে ফাঁসির অপেক্ষায় থাকা সম্প্রতি চাঞ্চল্যকর শিশু রামিসা হত্যার আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন।
একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বপ্না বলেন, জীবনসঙ্গীর পাপে আজ আমার জীবন নিষ্পেষিত। বাবা-মায়ের কথা মেনে সোহেলকে বিয়ে না করলে হয়তো এমন খেসারত দিতে হতো না। জেনেশুনে একজন মাদকাসক্তকে বিয়ে করার এমন করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে, তা কখনো ভাবিনি।
কারাগারের বিশেষ সূত্র জানায়, কনডেম সেলে কান্নাকাটিতেই দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে স্বপ্নার। প্রথম ভেঙে যাওয়া সংসারে রেখে আসা নিজের ছেলে আর মায়ের মুখ মনে করে কাঁদেন তিনি।
সূত্র জানায়, স্বপ্নার বাড়ি নাটোরের সিংড়ার চৌগ্রামে। বাবার নাম জিহাদুল ইসলাম। সম্প্রতি শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০ মে থেকে কারাগারে রয়েছেন তিনি। এ মামলায় ফাঁসির রায় ঘোষণার পর থেকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে রয়েছেন তিনি।
রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিনি স্বামী সোহেলের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এ ঘটনায় ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
২০১২-১৩ সালের দিকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় রুহুল আমিন নামে এক ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি সিংড়াতে তিনি বসবাস করতে থাকেন। বিয়ের প্রায় পাঁচ বছর পর ২০১৭ সালে তার একটি ছেলে সন্তান হয়। ছেলের বয়স যখন তিন বছর, তখন স্বামী তাকে ডিভোর্স দেন। ডিভোর্সের পর স্বপ্না মায়ের কাছে চলে আসেন। সেখানে আনোয়ারা চক্ষু হাসপাতালে আয়ার কাজ নেন।
পরবর্তীতে পরিবার থেকে আবার বিয়ে করতে বললে সন্তানের কথা চিন্তা করে রাজি হননি। একদিন তার এক চাচা সোহেলকে (বর্তমান স্বামী) তাদের বাসায় নিয়ে আসেন। তখন এলাকার লোকজন বলেন, এই ছেলে (সোহেল) ভালো নয়, নেশা করে। সোহেল প্রতিদিন পাঁচ পিস ইয়াবা সেবন করতেন।
ইয়াবা খেতে নিষেধ করলে বলতেন আর খাবেন না, ছেড়ে দেবেন। সোহেলও পূর্বে একটি বিয়ে করেছিলেন। সে ঘরে তার সাত বছরের একটি সন্তান আছে বলে জানিয়েছিলেন। তাই স্বপ্নার বাবা-মা ও চাচা বিয়েতে রাজি ছিলেন না।
স্বপ্নাকে দেখতে আসার দিন সোহেল তাকে মোবাইল নম্বর দিয়ে যান এবং তার মোবাইল নম্বর নেন। এক পর্যায়ে ২০২৩ সালে বাবা-মাকে না জানিয়েই বিয়ে করে ফেলেন।
শ্বশুরবাড়িতে (সিংড়া) পাঁচ মাস থাকার পর সোহেল তাকে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে আসেন। প্রায় দুবছর তারা নারায়ণগঞ্জে থাকার পর সাভারের বাইপাইল চলে যান এবং সোহেল সেখানে রিকশাভ্যানের পার্টসের দোকান দেন। দোকান ভালো না চলায় তারা মিরপুরে চলে আসেন।
মিরপুর বিহারি ক্যাম্পে তারা দেড় মাস থাকার পর ক্যাম্পের পরিবেশ ভালো নয় বলে সোহেল তাকে মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে আসেন। ওই ফ্ল্যাটে তারা তিন ফ্যামিলি মিলে সাবলেট থাকতেন। একজন ভাড়ায় বাইক চালাতেন, একজন রঙমিস্ত্রির কাজ করতন। আর ফ্ল্যাটের নিচতলার গ্যারেজে সোহেল মেকানিকের কাজ করতেন। ঘটনার দিন পর্যন্ত ওই ফ্ল্যাটে তারা দুই মাসের মতো অবস্থান করেন। দুই মাসের মধ্যে একদিন রামিসাদের বাসায় গিয়েছিলেন। এছাড়া সিঁড়িতে ওঠানামার সময় তাদের সঙ্গে দেখা হতো।
ঘুম থেকে উঠে দেখি রামিসার অবস্থা
ঘটনার দিন অন্য যে দুই ফ্যামিলি সাবলেট থাকত, তারা কেউ ফ্ল্যাটে ছিল না। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঘুম থেকে উঠে স্বপ্না দেখেন তার স্বামী সোহেল মোবাইল টিপছেন।
তখন স্বপ্না বলেন, মাথাব্যথা করছে, একটু ওষুধ এনে দাও। তখন সোহেল নিচ থেকে ঘুরে এসে বলেন, ‘এখন দোকান খোলা নেই, দোকান খুললে পরে ওষুধ এনে দেব।’
সোহেল বারবার বাসার উপর-নিচে আপ-ডাউন করতে থাকেন। আধঘণ্টা পর সোহেল ওষুধ এনে বলেন, ‘তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে থাক। আমি কাজে যাব। ১২টার দিকে ঘুম থেকে উঠে রান্না করবা।’ এরপর স্বপ্না ঘুমিয়ে পড়েন।
এক পর্যায়ে বাইরে থেকে দরজা ধাক্কানোর শব্দ শুনে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমের দিকে তাকিয়ে রক্ত দেখতে পান। ফ্ল্যাটের দরজার গোল লকের ফাঁকা দিয়ে দেখতে পান বাইরে সবাই তাদের দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। এক পর্যায়ে লোকজন দরজা ভেঙে ফ্ল্যাটে ঢুকে খাটের নিচে মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন লাশ এবং বালতিতে রামিসার মাথা দেখতে পায়।’
হত্যার পর পালান সোহেল
আদালতের নথি সূত্রে জানা গেছে, রামিসাকে বাথরুমে আটকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন সোহেল। এরপর লাশ গুম করতে ছুরি দিয়ে মাথা কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধবিচ্ছিন্ন করে লাশ বাথরুম থেকে এনে খাটের নিচে রেখে দেন।
কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান। রামিসাকে হত্যার সময় স্বপ্না উপস্থিত ছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডে স্বামীকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় অপরাধীকে পালাতে সহায়তা করায় স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত তাকে হত্যাকাণ্ডের ‘সহযোগী’ হিসেবে সাব্যস্ত করে।
সাক্ষ্য-প্রমাণে স্বপ্নার ভূমিকা
রামিসাকে হত্যার পর সোহেলকে পালানোর সুযোগ সৃষ্টি করে দেন স্বপ্না। ঘটনার দিন উত্তেজিত জনতা যখন বাইরে থেকে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিল, তখন স্বপ্না দরজা আটকে রেখে স্বামী সোহেলকে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান প্রসিকিউশন বিভাগে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন। এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, ‘সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ এবং স্বপ্নার বিরুদ্ধে হত্যায় সহায়তার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।’
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শিশু রামিসা আক্তার (৮) পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না তাকে কৌশলে নিজের ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে নিয়ে যান। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে এক পর্যায়ে আসামির কক্ষের সামনে তার জুতা দেখতে পান রামিসার পরিবারের সদস্যরা।
ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়া না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্য বাসিন্দারা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। পরে তারা আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন লাশ এবং তার মাথা কক্ষের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান।
এ সময় স্বপ্নাকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি জানান, তার স্বামী সোহেল রানা (৩০) হীনকামনা চরিতার্থ করার জন্য রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে গলা কেটে হত্যা করেছে।
এ ঘটনায় ১৯ মে শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলার পর প্রথমে স্বপ্নাকে, এরপর সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সূত্র : আমার দেশ