

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ছক চূড়ান্ত হয় দেশের বাইরে, সিঙ্গাপুরে বসে। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, পাঁচ দিনব্যাপী একাধিক গোপন বৈঠকের মধ্য দিয়েই এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা করা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পী এবং হত্যায় সরাসরি অংশ নেওয়া শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ। দেশি-বিদেশি একাধিক গ্রুপ এই পরিকল্পনায় সক্রিয় ছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। এদিকে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের আগে মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বিকেলে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা মহানগর পুলিশ।
সেখানে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন সময়ের আলোচিত রাজনৈতিক কণ্ঠ। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি সভা-সমাবেশ, টেলিভিশন টকশো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অতীত সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে কঠোর সমালোচনা করতেন।
এতে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিশোধপরায়ণতা তৈরি হয়। এর জের ধরেই একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পী।
আর হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়েছে সরাসরি গুলিবর্ষণকারী ফয়সাল করিম মাসুদকে।
ডিবি হাদি হত্যা মামলায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ফয়সাল করিম মাসুদ (৩৭), আলমগীর হোসেন (২৬), তাইজুল ইসলাম বাপ্পী (৪৩), ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১), জেসমিন আক্তার (৪২), মো. হুমায়ূন কবির (৭০), হাসি বেগম (৬০), সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), সিবিয়ন দিও (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) এবং মো. ফয়সাল (২৫)। এদের মধ্যে ফয়সাল করিম মাসুদ, আলমগীর হোসেন, তাইজুল ইসলাম বাপ্পী, জেসমিন আক্তার ও মুক্তি মাহমুদ এখনো পলাতক। ডিবি জানায়, কাউন্সিলর বাপ্পীর নির্দেশনা ও সরাসরি পরিকল্পনায় হত্যাকাণ্ডটি বাস্তবায়িত হয়। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ গুলি চালান এবং আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী আলমগীর হোসেন তাকে সহযোগিতা করেন। হত্যাকাণ্ডের পরপরই তারা ভারতে পালিয়ে যান।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ফয়সালের ভগিনীপতি মুক্তি মাহমুদ ও দালাল ফিলিপ স্নাল তাদের দেশত্যাগে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদন ‘পজিটিভ’ এসেছে বলে জানিয়েছে ডিবি। তদন্তে জানা গেছে, হত্যার আগে থেকেই হাদির গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা এবং ধারাবাহিক গণসংযোগ তার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। এ পর্যন্ত মামলায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নতুন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছে ডিবি।
ডিবির তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের রাতেই বাপ্পীর ভগিনীপতি আমিনুল ইসলামের সহায়তায় ফয়সাল ও আলমগীর দেশ ছাড়েন। বাপ্পীর সরাসরি নির্দেশে দালাল ফিলিপের মাধ্যমে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত ব্যবহার করে তারা ভারতে প্রবেশ করেন। বর্তমানে আমিনুল ইসলাম গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। পলাতক আসামি ফয়সাল করিম সম্প্রতি একাধিক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, তাকে ও তার পরিবারকে ফাঁসানো হচ্ছে। এ বিষয়ে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে সেগুলো এআই দিয়ে তৈরি নয় এবং প্রাথমিকভাবে আসল বলেই নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে ফয়সালের দুবাইয়ে থাকার দাবি সঠিক নয়। তদন্তের তথ্য অনুযায়ী তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। ডিবি জানায়, গত বছরের ২১ জুলাই শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ সিঙ্গাপুর যান। পরদিন সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া সীমান্তবর্তী একটি হোটেলে আওয়ামী লীগের চারজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে তার গোপন বৈঠক হয়।
পাঁচ দিনব্যাপী ওই বৈঠকেই হত্যার চূড়ান্ত রূপরেখা, অর্থের লেনদেন এবং দায়িত্ব বণ্টন নির্ধারণ করা হয়। দেশে ফেরার পর ফয়সালের সন্তানের নামে ৫৫ লাখ টাকার একটি ফিক্সড ডিপোজিট খোলার তথ্য পায় তদন্ত সংস্থা। তদন্তকারীদের মতে, এই অর্থ হত্যাকাণ্ডের পারিশ্রমিক ও পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যয়ের অংশ।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা অবস্থায় শরিফ ওসমান বিন হাদির মাথায় গুলি করা হয়।
মোটরসাইকেলে থাকা হামলাকারীরা পরিকল্পনা অনুযায়ী মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় হত্যা মামলা হয়। বাদী ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে এবং সব প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়বে। হাদি হত্যাকাণ্ড দেশের রাজনীতিতে ভিন্নমতের নিরাপত্তা, নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রভাব এবং পলাতক অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়ার বাস্তবতা নতুন করে সামনে এনেছে। অভিযোগপত্র দাখিল হলেও হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মন্তব্য করুন