

সাত্তার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর ই আলম রানা। তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের ব্যাংক ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার অভিযোগ উঠেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর সুপারিশে একটি রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংক থেকে ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। পরে প্রভাব খাটিয়ে ঋণ পরিশোধ প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেন তিনি।
এদিকে অগ্রণী ব্যাংক এ বিষয়ে একের পর এক পদক্ষেপ নিলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। উল্টো টাকা না দেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে রেখেছেন ‘বিগ বটম লিমিটেড’।
অভিযোগ আছে, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তৎকালীন মন্ত্রী শাহজাহান খানের প্রভাব খাটাতেন এই নূর ই আলম রানা। যদিও ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এই ‘ধূরন্ধর’ এখন ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতাদের আশীর্বাদ পেতে দলটির অফিসে ঘুরছেন।
ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, সাত্তার গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানের নামে অগ্রণী ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৬১১ কোটি টাকা। যা সুদ ও আসলসহ বর্তমান স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুমোদিত সীমার চেয়েও বেশি ঋণ বিতরণের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাত্তার জুট অ্যান্ড ফাইবার্স লিমিটেডের নামে অগ্রণী ব্যাংক থেকে সিসি প্লেজ লোন নেওয়া হয়েছে ৪৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার। অথচ ঋণসীমা ছিল ৪০ কোটি। অর্থাৎ ৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত প্লেজ লোন দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক।
এছাড়া এই কোম্পানিকেই সিসি ব্লক হিসেবে ৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা লোন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিসি হাইপো হিসেবে ৩০ কোটি ঋণসীমা অতিক্রম করে দেওয়া হয়েছে ৩৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
জানা গেছে, এই ঋণের বিপরীতে যে পরিমাণ সম্পদ গোডাউনে থাকার কথা সে পরিমাণ সম্পদ গোডাউনে পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল।
এই গ্রুপের আরেকটি প্রতিষ্ঠান স্টেয়ার ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। এই কোম্পানিটির নামে সিসি হাইপো ঋণ নেওয়া হয়েছে ২৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার। অথচ ঋণসীমা ছিল ২০ কোটি টাকা। প্লেজ লোন নেওয়া ৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকার কিন্তু ঋণসীমা ছিল ৭ কোটি টাকা। ব্লক লোন নেওয়া হয়েছে ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার।
গ্রুপটির আরেক প্রতিষ্ঠান, স্পান স্টার নামের কোম্পানি সিসি হাইপো লোন নিয়েছে ২৭ কোটি ২৬ লাখ টাকার। অথচ ঋণসীমা ছিল ২২ কোটি টাকা। এদিকে প্লেজ লোনের সীমা ১৫ কোটি টাকা হলেও ঋণ নেওয়া হয়েছে ১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার। সেভেন হ্যাভেন নামের কোম্পানিটির পক্ষে হাইপো লোন নেওয়া হয়েছে ৪৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকার। আর প্লেজ লোন নেওয়া হয়েছে ৩৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
সাত্তার গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান এসএলজি ইউনিক লিমিটেডের নামে সিসি হাইপো ঋণ নেওয়া হয়েছে ৬৫ কোটি ৩ লাখ টাকা যার ঋণসীমা ছিল ৫৫ কোটি টাকা। সাত্তার ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের নামে হাইপো ঋণ নেওয়া হয়েছে ১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকার।
অগ্রণী ব্যাংক থেকে এসএলজি বেস্ট লিমিটেডের নামে হাইপো ঋণ দেওয়া হয়েছে ৩৯ কোটি ৭১ লাখ টাকার যার ঋণসীমা ছিল ৩৪ কোটি টাকা। ৫০ কোটি টাকা ঋণসীমার প্লেজ লোন দেওয়া হয়েছে ৬২ কোটি ৩৫ লাখ টাকার। ব্লু গ্রের নামে ২৫ কোটি ঋণসীমার প্লেজ লোন দেওয়া হয়েছে ৩১ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং ৩০ কোটি ঋণসীমার হাইপো ঋণ দেওয়া হয়েছে ৩৮ কোটি ২২ লাখ টাকার।
এদিকে গোল্ডেন প্যারট ও গ্লো ওভার লিমিটেডের নামে দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে ৫১ কোটি ৩০ লাখ ও ৫০ কোটি ২০ লাখ টাকার ঋণ। অগ্রণী ব্যাংকের পক্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের অনূকুলে মোট ৬১১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার ঋণ প্রদান করা হয়েছে।
অভিযোগ আছে, ঋণের অর্থ ব্যবসায়িক কাজে যথাযথভাবে ব্যবহার না করে নিজের মনের মতো করে খরচ করেছেন নূর ই আলম রানা। যেমন বাড়ি নির্মাণ, ফ্ল্যাট ক্রয় এবং জমি কেনা।
নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ প্রদানের পর ব্যাংকের দায়িত্ব ছিল টাকার ব্যবহার যথাযথভাবে হচ্ছে কি না তা তদারকি করা। অভিযোগ আছে, ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়ে আর শোধ করছেন না সাত্তার গ্রুপের এমডি।
এই ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টার ছিলেন রানার শ্বশুর সাবেক রূপালী ব্যাংক কর্মকর্তা সাইফুল আলম ও তার বড় ভাই লুতফর মোল্লা। লুতফর মোল্লা আবার সাব-রেজিস্টার হিসেবে সর্বশেষ নীলফামারির জলঢাকায় দায়িত্বরত ছিলেন।
এ বিষয়ে জানতে বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি নূর ই আলম রানাকে। তার ভাই লুতফর মোল্লাকে বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়ার পর পাওয়া যায়।
অভিযোগের বিষয়ে জানালে তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘আমি কোনো ঋণের গ্যারান্টার ছিলাম না। ওর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আমি সাব-রেজিস্ট্রার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছি।’ এ কথা বলেই তিনি ফোন কেটে দেন। এরপরে আবার ফোন দিয়েও তাকে সংযোগ করানো যায়নি।
এমন অনিয়মের বিষয়ে জানতে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ফোন দেয়া হলে তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘সাত্তার গ্রুপ যখন ঋণ পেয়েছিল তখন আমি এমডি ছিলাম না। এক্সাক্টলি কী হয়েছে বলতে পারবো না।’
এদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে শুধুমাত্র গ্রাহকই দায়ী নয়। ব্যাংকের দায় আরও বেশি। যেসব গ্রাহকের ঋণ পাওয়ার কথা নয় কিংবা ঋণ পাওয়া উচিত ১০০ টাকা, ব্যাংকের যোগসাজশে সে গ্রাহক লোন পেয়েছে ৫০০ টাকা। গ্রাহকের লোন ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না তা যাচাই না করেই দেওয়া হয়েছে ঋণ। এতে করে গ্রাহক আর ঋণ ফেরত দিতে পারছে না। এমন ঘটনায় ব্যাংক এবং গ্রাহক উভয়কেই শাস্তি পেতে হবে।’
মন্তব্য করুন