সোমবার
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমদানিতে ঝুঁকি কমাতে হেজিং সুবিধা চালু করল বাংলাদেশ ব্যাংক

এনপিবি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand

আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামের ওঠানামাজনিত ঝুঁকি কমাতে আমদানিকারকদের জন্য কমোডিটি প্রাইস হেজিং সুবিধা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকের মাধ্যমে যোগ্য আমদানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ধরনের হেজিং পণ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট-১ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। ‘গাইডলাইনস অন হেজিং অব কমোডিটি প্রাইস রিস্ক ফর ইমপোর্ট ট্রেডস ইন ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটস, ২০২৬’ শীর্ষক এই নির্দেশনা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, বৈশ্বিক পণ্যের বাজারের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে আমদানিকারকদের মূল্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা জরুরি। এ ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবসায়িক ব্যয় পরিকল্পনা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।

যেসব আমদানিকারক সুবিধা পাবেন

নতুন নীতিমালার আওতায় কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য— যেমন অপরিশোধিত তেল, ভোজ্যতেল, ধাতু, শস্য, সার ও অন্যান্য প্রাথমিক পণ্য আমদানিকারকরা হেজিং সুবিধা নিতে পারবেন। দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিকারক এবং কৌশলগত বা বড় পরিসরে আমদানিতে নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠানও এ সুবিধার আওতায় থাকবে।

তবে হেজিং সুবিধা পেতে প্রকৃত আমদানি-ঝুঁকির প্রমাণ দিতে হবে। এ জন্য বৈদেশিক মুদ্রায় করা নিশ্চিত আমদানি আদেশ, এলসি অথবা ক্রয়চুক্তির মতো নথি থাকতে হবে।

চার ধরনের হেজিং পণ্য

বাংলাদেশ ব্যাংক চার ধরনের হেজিং ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। এগুলো হলো— আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক্সচেঞ্জে কমোডিটি ফিউচার, রেফারেন্স কমোডিটি সূচকভিত্তিক ফরওয়ার্ড চুক্তি, কমোডিটি সোয়াপ এবং কমোডিটি অপশন।

এর মাধ্যমে কোনো আমদানিকারক ভবিষ্যতে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে আগেই নির্দিষ্ট দামে ঝুঁকি সীমিত করতে পারবেন। যেমন, কোনো আমদানিকারক তিন মাস পর গম কিনবেন- এমন ক্ষেত্রে ফিউচার চুক্তির মাধ্যমে বর্তমান দামের কাছাকাছি একটি মূল্য ধরে রাখার সুযোগ থাকবে। বাজারদর বেড়ে গেলে ফিউচার থেকে পাওয়া লাভ বাড়তি আমদানি ব্যয়ের একটা অংশ পুষিয়ে দিতে পারবে।

আমদানি মূল্যের ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হেজিং

নতুন নির্দেশনায় আমদানিকারকরা তাদের প্রকৃত কমোডিটি এক্সপোজারের সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হেজ করতে পারবেন। প্রয়োজনে আংশিক হেজিংও করা যাবে। তবে একাধিক হেজিং চুক্তির সম্মিলিত মূল্য কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট আমদানি-এক্সপোজারের বেশি হতে পারবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, হেজিংয়ের উদ্দেশ্য হবে প্রকৃত মূল্যঝুঁকি কমানো; জল্পনামূলক বা লিভারেজভিত্তিক লেনদেনের জন্য এ সুবিধা ব্যবহার করা যাবে না। হেজিংয়ের পরিমাণ ও মেয়াদও সংশ্লিষ্ট আমদানি লেনদেনের মূল্য ও মেয়াদের বেশি হতে পারবে না।

ব্যাংকের মাধ্যমে করতে হবে

আমদানিকারকদের হেজিং লেনদেন এডি ব্যাংকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে করতে হবে। প্রতিটি লেনদেনের জন্য আমদানি চুক্তি, এলসি বা নিশ্চিত ক্রয়াদেশসহ পণ্যের ধরন, পরিমাণ, মান এবং সম্ভাব্য সরবরাহের তারিখের প্রমাণপত্র দিতে হবে।

ওটিসি ডেরিভেটিভ ব্যবহার করা হলে এক্সচেঞ্জে লেনদেনের পরিবর্তে কেন ওই পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে, তার যৌক্তিকতা নথিবদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি হেজিং কার্যক্রম আমদানিকারকের পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতির আওতায় হতে হবে।

নিরীক্ষকের সনদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট

প্রতিটি হেজিং লেনদেনের নথিপত্র সংরক্ষণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট এডি ব্যাংককে আমদানিকারকের স্ট্যাটিউটরি অডিটরের কাছ থেকে বার্ষিক সনদ নিতে হবে। এতে হেজিং লেনদেন প্রকৃত আমদানি-ঝুঁকির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, মার্জিন ও প্রিমিয়াম পরিশোধ ওই ঝুঁকির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতি যথাযথ কি না—তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া এডি ব্যাংকগুলোকে আমদানিকারকভিত্তিক হেজিং লেনদেনের তথ্য প্রতি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। কোনো অনিয়ম, খেলাপি, জল্পনামূলক ব্যবহার বা নির্দেশনার অপব্যবহার হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে।

লাভের নিশ্চয়তা নয় হেজিং

বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, হেজিং কোনো মুনাফা অর্জনের পদ্ধতি নয়; এটি মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি উপায়। এতে বাজার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। বরং বাজারদর বিপরীত দিকে গেলে হেজিং চুক্তিতেও ক্ষতি হতে পারে। তাই চুক্তিতে যাওয়ার আগে প্রিমিয়াম, মার্জিন, মার্ক-টু-মার্কেট মূল্যায়ন, সম্ভাব্য দায় ও সেটেলমেন্ট প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমদানিকারককে অবহিত করতে হবে।

এডি ব্যাংকগুলোকে কমোডিটি ডেরিভেটিভ লেনদেনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, যথাযথ যাচাই ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে পূর্বানুমোদন নিয়ে তবেই এডি ব্যাংকগুলো নতুন কমোডিটি প্রাইস হেজিং পণ্য চালু করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, ভোজ্যতেল, গম, ধাতু, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে আমদানিকারকদের ব্যয়-ঝুঁকি আগেভাগে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হলো।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank