

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলমান থাকা সত্ত্বেও পটুয়াখালীর গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, দশমিনা, বাউফল, দুমকি উপজেলা ও আশপাশের নদ-নদীতে অবাধে চলছে মা ইলিশ শিকার। সন্ধ্যা নামলেই ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে নদীতে নামছে জেলেরা। নদীতে অভিযান চললেও জেলেরা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অব্যাহত রাখছে মাছ ধরা, বিক্রয় ও পাচারের কার্যক্রম।
শেষ বিকেলে নদীতে নেমে পড়ছে জেলেরা: রাঙ্গাবালী উপজেলার আগুনমুখা নদীতে প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় অবৈধ মাছ ধরার উৎসব। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় জাল ফেলে মা ইলিশ শিকার করছেন জেলেরা। এ উপজেলার মৎস্য বিভাগ অভিযান পরিচালনা করলেও টহল দলের গতিবিধি ফাঁস হয়ে যায় বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, জব্দকৃত মাছ ভাগভাটোয়ারা করে নিয়ে যাওয়ার। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে জেলার তেঁতুলিয়া, বুড়াগৌরাঙ্গ, রাবনাবাদ ও পায়রা নদীতেও। স্থানীয়দের অভিযোগ—প্রশাসনের অভিযান দলের সাথে অনেকটা লুকোচুরি করেই অবাধে মাছ ধরেন জেলেরা। তাদের নৌকার গতি প্রশাসনের ট্রলারের চেয়ে বেশি হওয়ায় ধরা পড়ার আশঙ্কাও কম।
অবৈধ ইলিশের হাট: গলাচিপায় নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নিয়মিত বসছে অবৈধ ইলিশের হাট। চরবিশ্বাস, চরবাংলা, নোমোর স্লুইসগেট, চরকাজল, বদনাতলী ও চরকারফারমাসহ অন্তত ৮-১০টি স্পটে চলছে গোপন বেচাকেনা। এসব হাটে অপরিচিত কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। নির্দিষ্ট দালাল ও ক্রেতাদের মাধ্যমেই বিক্রি হচ্ছে ইলিশ মাছ। এমনকি যেখানে মাছ বিক্রি হয়, সেখানে কেউ মোবাইল ফোন নিয়েও যেতে পারে না—এমন তথ্যও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চরকাজলের জেলে সাইদুল মিয়া জানান, “নোমোর স্লুইসগেট এলাকায় প্রতিদিনই ইলিশ ধরা হয়। নির্ধারিত দালালকে ফোনে বললেই বাড়িতে পৌঁছে যায় মাছ। পরিচিত না হলে কেউ কিনতে পারে না।”
রাঙ্গাবালীর চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের শিক্ষার্থী পরশ মাহমুদ জানান, গত শুক্রবার বিকেলে আগুনমুখা নদীর পাড়ে গিয়েছিলাম। দেখলাম অসংখ্য জেলে নৌকা অবাধে ইলিশ ধরছে। এ সময় কোন প্রশাসনের ট্রলার দেখিনি। জেলেরা স্বাচ্ছন্দ্য মাছ ধরছে। এভাবে চলতে থাকলে ইলিশ উৎপাদন ব্যহত হবে একই সাথে অভিযান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রশাসন কঠোর হলে জেলেরা মাছ ধরতে পারত না।
নিষেধাজ্ঞার সহায়তা অপ্রতুল: ৪ অক্টোবর হতে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। এসময়কালে নিবন্ধিত জেলেদেরকে ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। তবে এ সহায়তার আওতাভুক্ত হয়নি সকল জেলে। যার ফলে সংসার ও ঋণের চাপে ঝুঁকি নিয়ে হলেও ইলিশ ধরেছে জেলেরা। তারা বলছেন, যে সহায়তা দেয়া হয় তা আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। এমনকি সবাই পায় না।
প্রশাসনের অভিযান থাকলেও কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ: জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২৫ অক্টোবর রাতে শেষ হয়’। অভিযানের ২২ দিনে ১৭৬টি মামলা ও ১৫১টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ১১১ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৬ লাখ মিটার অবৈধ ইলিশ জাল জব্দ করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৩০ লাখ টাকা। অভিযানে প্রায় দেড় মেট্রিক টন ইলিশ জব্দ হয়েছে। তবুও নদীতে ইলিশ শিকার বন্ধ করা যায়নি।
দশমিনা নৌ-পুলিশের পরিদর্শক মো. ফেরদৌস আহম্মেদ বলেন, “আমাদের দায়িত্বের এলাকা প্রায় ৪০ কিলোমিটার। আমরা এক প্রান্তে অভিযান চালালে জেলেরা অন্য প্রান্তে চলে যায়। খবর পৌঁছাতে তিন ঘণ্টা সময় লেগে যায়—ততক্ষণে তারা স্থান বদলে ফেলে।”
অন্যদিকে গলাচিপা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী জানান, “জেলেরা সংঘবদ্ধভাবে আইন ভঙ্গ করছে। আমরা প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছি, কিন্তু জনবল ও যান সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
হামলা ও ভয়ভীতির মুখে প্রশাসন: গত বছরগুলোর তুলনায় এবার জেলেদের ‘উগ্রতা’ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন। কয়েক দফায় টহল দলের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
প্রজনন রক্ষায় ব্যর্থতার শঙ্কা: নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন প্রতিদিনই ইলিশ ধরা, পাচার ও বিক্রির ঘটনা ঘটছে। নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম ব্যর্থতার মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নদীতে অবৈধ জেলেদের অবাধ বিচরণ, গোপন ইলিশ হাট, আর প্রশাসনের সীমিত সক্ষমতা—সব মিলিয়ে ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে বড় প্রশ্নচিহ্ন। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে অবৈধ মাছ ধরা অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
ইলিশ ধরায় বাধা নেই: শনিবার মধ্য রাতে শেষ হচ্ছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। রোববার থেকে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ ধরায় নেই কোন বাধা-বিপত্তি। আগের তুলনায় ইলিশ আহরণ বেশি হবে বলে প্রত্যাশা জেলেদের।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, “অসাধু একটি চক্র কৌশলে নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে ইলিশ শিকার করছে। জনবল সংকট ও নিরাপত্তাজনিত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও আমরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।”
মন্তব্য করুন