বুধবার
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কবর খুঁড়ে অস্থি সরিয়ে নিচ্ছে এলাকাবাসী

পটুয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম
কবর খুঁড়ে অস্থি সরিয়ে নিচ্ছে এলাকাবাসী
expand

প্রিয়জনের কবর খুঁড়ে অস্থি সরিয়ে নেওয়ার মতো বেদনাদায়ক কাজ করতে হচ্ছে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার হাজিরহাটের বাসিন্দাদের। অব্যাহত নদীভাঙনে বদলে গেছে এলাকার চিরচেনা পটভূমি। যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল ঘর, সড়ক, পূর্বপুরুষের কবর; তার অনেকটাই আজ আগ্রাসী তেঁতুলিয়া নদীর গর্ভে। এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে নদীভাঙন প্রতিরোধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবিতে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টায় লঞ্চঘাট এলাকায় মানববন্ধন করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা।

গত কয়েক দিন ধরে তেঁতুলিয়া নদীর বুকে যে অস্থিরতা জমছিল, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তা যেন হঠাৎ ফুঁসে উঠল। অব্যাহত ভাঙনের পরেও এদিন রাত আটটার দিকে লঞ্চঘাটের পশ্চিম-উত্তর পাশে শুরু হওয়া ভাঙন মুহূর্তেই রূপ নেয় ভয়াবহতায়। তীর রক্ষায় ফেলা জিওব্যাগ, বছরের পর বছর ধরে গড়া সড়কের অংশ সব যেন গ্রাস করে নিল খরস্রোতা নদী। স্রোতের তোড়ে সড়ক ও বেড়িবাঁধের আরও অংশ যেকোনো মুহূর্তে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রহর গুনছেন মানুষ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তীর রক্ষায় ফেলা শতাধিক জিওব্যাগ চোখের সামনে ধসে গেছে নদীতে। পাকা সড়কের পিচ, মাটি ভেঙে তৈরি হয়েছে গভীর খাদ, যেখানে একদিন আগেও ছিল মানুষের চলাচলের পথ। ভাঙনের থাবা এখন পৌঁছে গেছে অর্ধশতাধিক বসতঘর আর শতাধিক কবরস্থানের দোরগোড়ায়। ইতিমধ্যে প্রায় ২০টি কবর হারিয়ে গেছে নদীর অতলে যাঁরা একদিন এই মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছিলেন, আজ তাঁদের শেষ ঠিকানাটুকুও অনিশ্চিত। ঘরের চাল, বেড়া, আসবাব সরিয়ে নিচ্ছেন আতঙ্কিত পরিবারগুলো। আর ঝুঁকিতে থাকা কবরস্থান থেকে স্বজনেরা নিজ হাতে কবর খুঁড়ে অস্থি সরিয়ে নিচ্ছেন নিরাপদ স্থানে এমন করুণ দৃশ্য এখন হাজিরহাটের নিত্যদিনের বাস্তবতা। যে মাটিতে প্রিয়জনদের শেষবিদায় জানিয়েছিলেন তাঁরা, সেই মাটিই আজ আর নিরাপদ নয় মৃতদের জন্যও।

শুধু ঘরবাড়ি বা কবরস্থান নয়, ভাঙনের ছায়া এখন পড়েছে হাজিরহাট জামে মসজিদ, বাজার আর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ওপরও।

দশমিনা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. লুৎফর রহমান বলেন, হাজিরহাটের মানুষ এখন ঘরবাড়ি ও বসতভিটা নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে নদীর ভাঙন যেভাবে বেড়েছে, তাতে রাতের মধ্যেই সড়কের অংশ ও পাউবোর জিওব্যাগ নদীতে চলে গেছে। সকালে ভাঙন আরও বিস্তৃত হয়েছে। তিনি বলেন, সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, মানুষের বসতভিটার পাশাপাশি কবরস্থানও রক্ষা করা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে প্রায় ২০টি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে; স্বজনদের ঝুঁকিপূর্ণ কবর থেকে মরদেহ সরিয়ে নিতে হচ্ছে। তিনি দ্রুত সড়ক ও বেড়িবাঁধ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানান।

সাবেক দশমিনা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. ফকরুজ্জামান বাদল বলেন, হাজিরহাটের নদীভাঙন এখন আর শুধু নদীতীরের সমস্যা নয়; এটি মানুষের বসতবাড়ি, যোগাযোগব্যবস্থা, কবরস্থান, মসজিদ ও বাজারকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে। তীব্র স্রোতে সড়ক ও তীররক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, জিওব্যাগও নদীতে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু জিওব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হবে না; প্রয়োজন স্থায়ী ও টেকসই নদীশাসন কার্যক্রম। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নিয়ম ও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে দ্রুত সড়ক ও বেড়িবাঁধ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতি আরও মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

মানববন্ধনে বাংলাদেশ শাসনতন্ত্র আন্দোলনের দশমিনা উপজেলা আহ্বায়ক মো. মজিবুর রহমান প্যাদা, হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জহিরুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. রুহুল আমিন মোল্লাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ভুক্তভোগী এলাকাবাসী এবং শিশু শিক্ষার্থীরাও উপস্থিত ছিলেন।

মানববন্ধন থেকে হাজিরহাটের ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে সড়ক ও বেড়িবাঁধ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কার, তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় নদীশাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানানো হয়। নিয়ম ও নির্ধারিত মানদণ্ড মেনে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতি আহ্বান জানান স্থানীয়রা।

দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ভাঙনপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন করে পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও বেড়িবাঁধ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টিও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank