


পায়রা সমুদ্র বন্দর, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (ইপিজেড), কুয়াকাটা-আলীপুর মৎস্য বন্দর এবং কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থাকায় পটুয়াখালী জেলা বরাবরই রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্ব পেয়ে এসেছে।
জাতীয় সংসদে জেলার ৪টি আসন দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই চেনা সমীকরণ ভেঙে গেছে। ব্যালটে নেই আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক।
তবুও নির্বাচনী মাঠে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ভোট।
নৌকা প্রতীক না থাকলেও ভোটার তালিকায় থাকা আওয়ামী লীগ সমর্থক বিপুল সংখ্যক ভোটারই এখন পটুয়াখালীর চারটি আসনের প্রার্থীদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছেন।
ফলে ধানের শীষ, হাতপাখা, ট্রাক, ঘোড়া, দাঁড়িপাল্লা, দেয়ালঘড়ি কিংবা ঈগল প্রতীকে যেই প্রার্থী নির্বাচন করুক না কেন, প্রায় সব প্রার্থীর প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে ঘুরে ফিরে আসছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের হিসাব।
প্রতিশ্রুতি, আড়ালের যোগাযোগ, হামলা-মামলা
মাঠপর্যায়ের আলোচনা ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ঘিরে নির্বাচনী প্রচারে এক ধরনের নীরব সমঝোতা ও দরকষাকষি চলছে।
প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলছেন না, তবে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা-কর্মীদের সঙ্গে প্রার্থীদের বৈঠক, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত আশ্বাস দেওয়ার তৎপরতা স্পষ্ট।
হামলা-মামলা থেকে রক্ষা, রাজনৈতিক ‘দেখভাল’, ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতির এমন নানা কথাও শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়।
স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ভোটের অঙ্ক কষতে গিয়ে প্রায় সব প্রার্থীই এক জায়গায় এসে ঠেকছেন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট ছাড়া জয় নিশ্চিত করা কঠিন।
ইত্যেমধ্যে নির্বাচনী সভা-সমাবেশে বিএনপিতে যোগদানের হিড়িক বইছে আওয়ামী লীগের কর্মীদের। অথচ ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে দলটির নেতা-কর্মীরা হামলা-মামলায় গ্রাম ছাড়া হয়েছেন।
ওইসব মামলার বাদী স্থানীয় বিএনপির নেতারা। রাঙ্গাবালী, কলাপাড়া, গলাচিপা, দশমিনা ও বাউফলে প্রচার-প্রচারণায় আশ্বাসের বার্তা দিয়ে আওয়ামী লীগকে কাছে টেনে নিয়েছে প্রার্থীরা।
বিএনপির ভেতরের হিসাব-নিকাশ
বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতেও এ বিষয়ে দ্বিধা ও মতভেদ স্পষ্ট। কেউ দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোট দেওয়ার কথা বলছেন, আবার কেউ প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট ছাড়া এই চার আসনের কোনো একটিতেও জয় পাওয়া কঠিন।
পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে বিএনপি জোটের মনোনীত ও গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর ট্রাক প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। হাসান মামুন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ছিলেন।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সমঝোতার প্রার্থী নুরুল হকের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়ে ঘোড়া প্রতীকে নির্বাচন করায় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিএনপি মনোনীত প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচনী মাঠে কাজ না করে হাসান মামুনের পক্ষে কাজ করায় ১৭ জানুয়ারি দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব
অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে
গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এরপরে বিএনপির পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের আরও ১২৯ টি কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। একই চিত্র রয়েছে সংসদীয় আসন পটুয়াখালী-২ (বাউফল)।
এখানে ধানের শীষের প্রার্থী শহিদুল আলমকে বিজয়ী করতে সহযোগীতা করছে না কেন্দ্রীয় বিএনপির দুই নেতার অনুসারীরা। মূলত মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ায় কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মো. মনির হোসেন ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আহম্মেদ তালুকদার এখন ভোটের মাঠে নীরব ভূমিকায় রয়েছে। যার ফলে বেকায়দায় রয়েছে ধানের শীষের প্রার্থী।
অপরদিকে পটুয়াখালী-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েও স্বস্তিতে নেই দলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষন বিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন।
ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান থাকলেও রাঙ্গাবালী ও কলাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্য, সাগর ইজারাসহ নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যালট ভোটে ভাটা পড়েছে।
বিকল্প শক্তির হিসাব:
জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের উপস্থিতিও এবার আলাদা করে আলোচনায় এসেছে। নির্বাচনের শুরুতে দুই দলের মধ্যে আসন সমঝোতার আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। ফলে এখন তারা বিভক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিদ্বতা করছেন।
পটুয়াখালী-১ (মির্জাগঞ্জ-দুমকি-সদর), পটুয়াখালী-২ (বাউফল), পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা–দশমিনা) ও পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) চারটি আসনের অতীত নির্বাচনী ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অধিকাংশ সময়ই আওয়ামী লীগ বা তাদের জোট প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। ফলে এবার প্রতীক বদলালেও ভোটের বাস্তবতা বদলায়নি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পটুয়াখালী-২ আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রচার তুলনামূলক বেশি হলেও এখানেও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোটকে ফল নির্ধারণের মূল ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে। পটুয়াখালী-৪ আসনেও বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও স্থানীয়দের মতে, পটুয়াখালীর চারটি সংসদীয় আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাস্তবতা এক কথায় নৌকা নেই, কিন্তু ভোট আছে।
আর সেই ভোটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা। কে কতটা সেই ভোট নিজের দিকে টানতে পারবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে জেলার চার আসনের চূড়ান্ত ফল।
মন্তব্য করুন