সোমবার
২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্যাসসংকটে নারায়ণগঞ্জে ভোগান্তি, বদলে গেছে রান্নাঘরের চিত্র

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫২ পিএম
ছবি: এনপিবি
expand
ছবি: এনপিবি

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নারায়ণগঞ্জের সিএনজিচালিত যানবাহনের চালক, সিএনজি স্টেশন মালিক ও আবাসিক গ্রাহকেরা। দিনের পর দিন স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা। এতে কমেছে তাদের আয়।

অন্যদিকে বিক্রি কমে লোকসানে পড়েছেন সিএনজি স্টেশন মালিকেরাও।

শুধু যানবাহন নয়, গ্যাসসংকটের প্রভাব পড়েছে আবাসিক এলাকাতেও। কমে গেছে গ্যাসের চাপ। অনেক বাসায় একসঙ্গে দুই চুলা জ্বালানো যাচ্ছে না। কোথাও দিনের বেলায় রান্না করা যাচ্ছে না, রাতে রান্না করতে হচ্ছে। আবার কোথাও বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।

রোববার (২৩ আগস্ট) নারায়ণগঞ্জের লিংক রোডের দুটি সিএনজি স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহনের পাশাপাশি গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশের আসামি বহনকারী গাড়ি এবং সরকারি দপ্তরের যানবাহনও। ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকার শাহাব্দিন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও সস্তাপুর এলাকার মাস সিএনজি ওয়ার্কার্স লিমিটেডে ছিল দীর্ঘ সারি।

মাস সিএনজি ওয়ার্কার্স লিমিটেডের কোষাধ্যক্ষ মাহমুদুল ইসলাম বলেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ২২ থেকে ২৪ হাজার ঘনমিটার গ্যাস পাওয়ার কথা তাঁদের। কিন্তু সংকট শুরুর পর সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। তিন দিন পর রোববার গ্যাস এলেও পরিমাণ ছিল মাত্র ২ থেকে ৩ হাজার ঘনমিটার।

তিনি বলেন, আগে প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ টাকার গ্যাস বিক্রি হতো। এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ২ লাখ টাকায়। সরবরাহ করা গ্যাস বিক্রি করেও প্রতি ১০০ টাকার গ্যাসে প্রায় ২০ টাকা লোকসান হচ্ছে।

মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘কর্মচারীদের বেতন কীভাবে দেব, সেটিই এখন চিন্তার বিষয়। এভাবে চলতে থাকলে দিন শেষে আমাদের চাকরি থাকবে কি না, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছি।’

পাম্পটির প্রকৌশলী সৈয়দ বাদশাহ মিয়া বলেন, স্বাভাবিক সময়ে তাঁদের লাইনে গ্যাসের চাপ প্রায় ১৫ পিএসআই থাকার কথা। কিন্তু গত ১৫ দিন ধরে চাপ প্রায় ছিল না বললেই চলে। তিন দিন পর রোববার গ্যাস এলেও চাপ ছিল ১ পিএসআইয়ের কম।

তিনি বলেন, ‘এখন ১০০, ২০০ বা ৩০০ টাকার বেশি গ্যাস দিতে পারছি না। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।’

ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

গ্যাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মো. রাজন মিয়া বলেন, ঢাকায় গ্যাসের জন্য তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তাই কম ভাড়ায় নারায়ণগঞ্জে এসে গ্যাস নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখানেও গ্যাসের চাপ নেই।

তিনি বলেন, ‘গ্যাসের এত সংকট থাকলে আমরা গাড়ি চালাব কীভাবে? পাম্পের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।’

গ্যাসসংকটে জরুরি সেবার যানবাহনও বিপাকে পড়েছে। অ্যাম্বুলেন্সচালক নুরুল ইসলাম বলেন, গত সপ্তাহে ছয় দিন পাম্পে অপেক্ষা করার পর ৮০০ টাকার গ্যাস পেয়েছিলেন। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় মাঝেমধ্যে তেল দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘গ্যাসের সংকটের কারণে তেল ব্যবহার করতে হয়। এতে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কিন্তু রোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে লোকসান দিয়েই জরুরি সেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।’

প্রাইভেটকারচালক নাজির হোসেন বলেন, এখন যে পাম্পেই যাচ্ছেন, সেখানে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা, কখনো তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এতক্ষণ অপেক্ষা করেও ৮০, ৯০, ১০০ কিংবা ১৫০ টাকার মতো অল্প গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমি এখন শাহাব্দিন পাম্পে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছি। কখন গ্যাস পাব, কতটুকু গ্যাস পাব, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। এভাবে তো গাড়ি চালানো সম্ভব নয়।’

শাহাব্দিন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের প্রকৌশলী তিমির সামাদ্দার বলেন, গ্যাসের চাপ খুবই কম। মেশিন ও গাড়িতে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত চাপ নেই। তারপরও গ্রাহকদের কিছুটা সুবিধা দিতে যতটুকু সম্ভব সরবরাহ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ১৫ পিএসআই চাপ থাকলে কার্যক্রম চালানো যায়। কিন্তু কয়েক দিন পর্যন্ত চাপ শূন্য ছিল। রোববার সাড়ে ৩ থেকে ৪ পিএসআইয়ের মতো চাপ পাওয়া যাচ্ছে।

রান্নাঘরেও দুর্ভোগ

গ্যাসসংকটের প্রভাব পড়েছে আবাসিক এলাকাতেও। ফতুল্লা রেলস্টেশন এলাকার বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, আগে দুপুর ১২টার দিকে রান্না শুরু করলে বেলা ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে রান্না শেষ হয়ে যেত। এখন পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় দুই চুলা একসঙ্গে জ্বালানো যায় না। একটি চুলা বন্ধ রাখলে অন্যটিতে কিছুটা গ্যাস আসে।

তিনি বলেন, ‘এখন সকালের নাশতা শেষ করেই সকাল ১০টার দিকে দুপুর ও রাতের রান্না শুরু করতে হচ্ছে।’

সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাঁর বাড়িতে দুই দিন ধরে গ্যাস নেই। মাঝে মধ্যে গ্যাস এলেও কিছুক্ষণ পর আবার চলে যায়। বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে দুপুরের খাবার কিনে খেতে হয়েছে। রাতের খাবার রান্না করতে পারবেন কি না, সেটিও নিশ্চিত নন তিনি।

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় একদিকে সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকদের দীর্ঘ সময় পাম্পে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে কমেছে তাঁদের আয়। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনগুলোর বিক্রি কমে বেড়েছে লোকসান। আবাসিক গ্রাহকদেরও রান্নাবান্নায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন