


বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী আইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম নারায়ণগঞ্জ আইন কলেজ। পূর্ব পাকিস্তানের আমল থেকে শুরু করে আজ অবধি দেশের আইন অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে দীর্ঘ ঐতিহ্য ও হাজারো শিক্ষার্থীর জীবনে আলো ছড়ালেও প্রতিষ্ঠানটি নিজেই যেন আটকে আছে ঘোর অন্ধকারে।
প্রায় সাড়ে ৫০০ শিক্ষার্থী, চারজন শিক্ষক এবং পাঁচজন কর্মচারীর জন্য একটি মাত্র জরাজীর্ণ ভবনে জোড়াতালি দিয়ে চলছে কলেজের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। ক্লাসরুম, অফিস কক্ষ, টয়লেট কিংবা বিশুদ্ধ পানির সুবিধা সবকিছুরই চরম সংকট। অথচ কলেজের নামে ব্যাংকে প্রায় ৬ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, এটি গণপূর্ত দপ্তরের ক-তফসিলভুক্ত পরিত্যক্ত সম্পত্তি। কলেজের নামে জমি রেজিস্ট্রি (দলিল) করার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় মূলত নতুন ভবন নির্মাণের কাজ আটকে আছে।
প্রক্রিয়াটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই জমি ছাড়ের আবেদন পাঠানোর কথা রয়েছে। জনকল্যাণমূলক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজে ক-তফসিলভুক্ত সম্পত্তি হস্তান্তরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন প্রয়োজন।
আইন কলেজের শিক্ষক অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর আগে তৎকালীন জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিনের সময়ে জমি ও ভবন নির্মাণের জন্য নকশা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়। নকশায় আট শতাংশ জমির ওপর ছয়তলা ভিত্তির দোতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া সয়েল টেস্ট ও ভূমি পরিমাপের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য (নারায়ণগঞ্জ-৫) আবুল কালাম এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন; দুজনই এই কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী। সিটি প্রশাসক, গভর্নিং বডির সদস্যরা এবং জেলা প্রশাসক সমন্বিত উদ্যোগ নিলে এই আইনি জটিলতার দ্রুত সমাধান সম্ভব।
এদিকে ২০০৮ সালেই স্থানীয় প্রশাসন নারায়ণগঞ্জ আইন কলেজ ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল। তবে এত বছরেও সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বর্তমান ভবনের ছাদ ও দেয়াল থেকে প্রায়ই পলেস্তারা খসে পড়ে আহত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। সামান্য বৃষ্টিতেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে ক্লাসরুম ও পাঠদানের উপকরণ নষ্ট হয়ে যায়। গত ২২ জুন রূপগঞ্জকে উৎপত্তিস্থল ধরে সংঘটিত ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের পর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
কলেজে উপযুক্ত লাইব্রেরি, পর্যাপ্ত বই, চেয়ার-টেবিল, এমনকি ছাত্র সংসদের নির্ধারিত কোনো কক্ষও নেই। একই সঙ্গে বর্তমানে ব্যবহৃত দুটি টয়লেট ও একটি ডিপ টিউবওয়েলও সাবেক জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থায়নে নির্মিত হয়েছিল বলে জানা গেছে। দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং পরিবেশগত চরম ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও নিয়ম রক্ষার খাতিরে বর্তমানে ক্লাস চালিয়ে নেওয়া নিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটি।
কলেজের অধ্যক্ষ আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন ভূঁইয়া বলেন, “১৯৭২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জমির ইজারা ভাড়া বাবদ ২৫ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। গত ১৩ মে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ গভর্নিং বডির সভায় সভাপতি ও জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে কলেজের ক্রয়কৃত সম্পত্তি এবং পুরোনো ভবনের মূল্য নির্ধারণ করে দলিল সম্পাদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
কলেজের গভর্নিং কমিটির সদস্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, নারায়ণগঞ্জ আইন কলেজের জমিটি বর্তমানে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে সরকারি খাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। ফলে এখানে নতুন ভবন নির্মাণের আগে জমিটি আইন কলেজের নামে রেজিস্ট্রি করা জরুরি।
তিনি জানান, এ লক্ষ্যে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার গত মাসে কলেজটি পরিদর্শন করেছেন। এরপর কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পরিত্যক্ত সম্পত্তিটি আইন কলেজের নামে রেজিস্ট্রি করার সুপারিশ করে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।
মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, “বিভাগীয় কমিশনারের অনুমোদন পাওয়ার পর জমি কলেজের নামে রেজিস্ট্রি করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এরপর নতুন ভবন নির্মাণসহ বাকি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা যাবে।”
কলেজের গভর্নিং বডির আহ্বায়ক ও জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির এনপিবি নিউজকে বলেন, “বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ আইন কলেজের কার্যক্রম একটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। এটি জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের অনেক খ্যাতিমান আইনজীবী এই কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির প্রতি সবার আলাদা আবেগ ও দায়বদ্ধতা রয়েছে।”
তিনি বলেন, সারা দেশের আইন কলেজগুলো সাধারণত জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে থাকে। এ কলেজের জন্য যে ভবনটি রয়েছে, সেটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির ওপর অবস্থিত। এ কারণে কলেজ কর্তৃপক্ষ, পরিচালনা কমিটি এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হচ্ছে, নির্ধারিত মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে সম্পত্তিটি আইন কলেজের অনুকূলে বরাদ্দ নিয়ে সেখানে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হোক।
জেলা প্রশাসক জানান, পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সে অনুযায়ী জমি ও ভবনের মূল্য সরকারি **রেট শিডিউল** অনুযায়ী নির্ধারণ করে সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাবসহ বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় থেকে মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভবনের মূল্যায়ন পুনরায় করার নির্দেশনা এসেছে। বর্তমানে সেই কাজ চলছে। পুনর্মূল্যায়ন শেষে আবারও প্রস্তাব পাঠানো হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট সভায় বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
মো. রায়হান কবির বলেন, “আমার মনে হয় বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই এগোচ্ছে। সঠিকভাবে মূল্য নির্ধারণ করে প্রস্তাব পাঠানো গেলে এবং কলেজের নির্ধারিত মূল্য পরিশোধের আর্থিক সক্ষমতা থাকলে, ভবিষ্যতে এই জমি ক্রয় করে নারায়ণগঞ্জ আইন কলেজের জন্য নতুন ভবন নির্মাণের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।”
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ আইনজীবীই এই কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় বর্তমানে হাজার হাজার সাবেক শিক্ষার্থী সফলতার সঙ্গে আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন।
দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী এই প্রতিষ্ঠানটিকে দ্রুত ঝুঁকিমুক্ত করে আধুনিক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।