

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


স্বামীকে নৃশংসভাবে খুন করার পর নিজেই থানায় গিয়ে মামলা করেন স্ত্রী। কাঁদতে কাঁদতে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন, বলেন- চোখের সামনে স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কয়েক মাসের তদন্তে পুলিশের সামনে উল্টো চিত্র ভেসে ওঠে। কক্সবাজারের পেকুয়ায় আলোচিত জসিম উদ্দিন হত্যা মামলায় এখন সেই স্ত্রীর বিরুদ্ধেই উঠেছে খুনের অভিযোগ; গ্রেপ্তারও হয়েছেন তিনি।
পুলিশের দাবি, পরকীয়ার সম্পর্ক আড়াল করতেই সাজানো হয়েছিল পুরো ঘটনাপ্রবাহ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বছরের ১০ আগস্ট গভীর রাতে পেকুয়া উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নের জারুলবুনিয়া সেগুন বাগিচা এলাকায় নিজ ঘরে খুন হন জসিম উদ্দিন। পরদিন সকালে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। ঘটনার পরপরই নিহতের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বাদী হয়ে পেকুয়া থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। সেই মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের জেরে কয়েকজন ব্যক্তি গভীর রাতে ঘরে ঢুকে তার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করে। তিনি নিজে পাশের ঘরে লুকিয়ে প্রাণে বাঁচেন বলে দাবি করেন।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজন প্রতিবেশীকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শুরু থেকেই ঘটনাস্থলের বর্ণনা, আলামত ও বাদীর বক্তব্যের মধ্যে অসংগতি লক্ষ্য করেন।
এক তদন্ত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঘরের ভেতরের পরিস্থিতি, দরজা-জানালার অবস্থা এবং ঘটনার সময় নিয়ে বাদীর বয়ানে অসামঞ্জস্য ছিল। বাইরে থেকে জোর করে ঢোকার সুস্পষ্ট চিহ্নও পাওয়া যায়নি।
তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ মোবাইল ফোনের কললিস্ট, স্থানীয়দের গোপন তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগের সূত্র ধরে জানতে পারে, সেলিনা আক্তারের সঙ্গে একই এলাকার আব্দুর রাজ্জাক নামে এক ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে জসিম উদ্দিন ওই সম্পর্কের বিষয়টি টের পান বা আপত্তিকর অবস্থায় তাদের দেখে ফেলেন। এরপরই তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়- এমন ধারণা জোরদার হয় তদন্তে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সুনয়ন বড়ুয়া বলেন, প্রথম মামলার বয়ান ও বাস্তব আলামতের মিল না পাওয়ায় আমরা বিকল্প দিকগুলো খতিয়ে দেখি। প্রযুক্তিগত তথ্য ও সাক্ষ্য মিলিয়ে ভিন্ন চিত্র সামনে আসে।
ঘটনার প্রায় এক মাস সাত দিন পর নিহতের বাবা মো. নুর আহমদ বাদী হয়ে নতুন একটি হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় তিনি পুত্রবধূ সেলিনা আক্তারকে প্রধান আসামি এবং তার কথিত পরকীয়া সঙ্গী আব্দুর রাজ্জাকসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন। নতুন মামলার তদন্তে আগের অভিযোগের অসংগতি, সাক্ষ্য ও প্রযুক্তিগত তথ্য একত্র করে পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়, প্রথম মামলাটি বিভ্রান্তিকর ছিল।
পুলিশ জানায়, নতুন মামলার পর থেকেই সেলিনা আক্তার আত্মগোপনে ছিলেন। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে কক্সবাজার শহরের পিটি স্কুল এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন পেকুয়া থানার এসআই সুনয়ন বড়ুয়া।
পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলম বলেন, শিলখালীর স্বামী হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
ঘটনার পর থেকেই এলাকায় নানা গুঞ্জন ছিল। প্রথম মামলার অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। এখন স্ত্রীর গ্রেপ্তারের খবরে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, শুরু থেকেই ঘটনাটা রহস্যজনক মনে হচ্ছিল। এখন শুনছি ঘরের ভেতরের ঘটনা অন্য রকম ছিল।
পুলিশ বলছে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার পরিকল্পনা, ঘটনার সময়কার সুনির্দিষ্ট ভূমিকা এবং প্রথম মামলার পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যেতে পারে। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার ও অভিযোগপত্র প্রস্তুতের কাজও চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলো প্রমাণিত নয়- তবে একটি হত্যাকাণ্ড ঘিরে কীভাবে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিতে চেষ্টা করা হয়েছিল, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন
