


আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষিত হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহার। দশটি মূল লক্ষ্য সামনে রেখে এই ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ শ্লোগানে নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার শিরোনাম দিয়ে এই ইশতেহার ঘোষণা হয়েছে।
আজ বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেলে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এই ইশতেহারে ৮ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এছাড়া ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দলটি।
উদ্বোধনী বক্তৃতায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি সাম্য ও ন্যায়ের বাংলাদেশ। তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন এ দেশের শিশুরা অন্য আরো উন্নত দশটি দেশের মত সুযোগ সুবিধা ও জীবন পাবে। রাষ্ট্র তাকে সহযোগিতা করবে। সমাজ তাকে অভিবাদন জানাবে। কৃষকের স্বপ্ন ছিল সে দেশের জন্য খাদ্য জোগাবে এবং বিনিময়ে সে সম্মান পাবে। শ্রমিক কলকারাখানায় কাজ করবে। এই শ্রমের বিনিময়ে সে সম্মান এবং সম্মানী পাবে। শিক্ষক তার সন্তানতুল্য ছাত্রদের তার মেধা উজার করে দিবেন। তেমনইভাবে তার শিক্ষার্থীরা সেই শিক্ষার সম্মান দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে শিক্ষককে সম্মান করবে।
তিনি আরো বলেন, কুটির শিল্পীরা অল্প পুঁজি দিয়ে দেশ গড়ার কাজে হাত বাড়িয়ে সম্মান চায়। একজন নারীর মা এবং নারী হিসেবে কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন। সন্তান জন্ম দেওয়া, বুকের দুধ খাওয়ানো, সন্তানকে তিলে তিলে গড়ে তোলা। বিনিময়ে সে চায় সম্মান এবং নিরাপত্তা। এছাড়া আমাদের দেশের সাধারণ নাগরিকের আবেদন হলো, তার সঙ্গে অন্যায় হলে সে ন্যায় বিচার আদালতে পাবে।
জামায়াত আমির বলেন, আমাদের দেশের মানুষের চাওয়া আকাশ সমান নয়। সীমিত চাওয়া। এই চাওয়াটাও রাষ্ট্র পূরণ করতে পারেনি। বেকারত্বের যন্ত্রণায় হাহাকার করছে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। আমাদের কীসের অভাব? সম্পদের অভাব হলে তো ১৫ বছরে সাড়ে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হতো না। আমাদের অভাব দেশপ্রেমের। আমাদের অভাব সততার।
দলটির প্রধান আরো বলেন, ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪ একই সুতোয় বাঁধা। ৪৭ না হলে ৭১ হতো না। ৭১ না হলে মানচিত্র পেতাম না। মানচিত্র না পেলে ২০২৪ সালের দেশকে গড়ার সুযোগ পেতাম না। তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের কাছে ইশতেহার হচ্ছে প্রমাণ। কীভাবে আগামীর দেশকে সাজাতে চায় তা একটি জীবন্ত দলিল হলো ইশতেহার। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও অঙ্গীকার হলো ইশতেহার। আমরা এমন একটা বাংলাদেশ গড়তে চাই যা সাধারণ মানুষ চায়। ৫ আগস্টের পরে কেউ কেউ তার অতীত ভুলে গেছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যুর বিষয়ে তিনি বলেন, আমি আহত সৈনিক। চতুর্দিক থেকে মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে। যারা অন্যায়ভাবে আমার চরিত্রহনন করেছেন তাদের সবাইকে মাফ করে দিলাম। আমার সাথে প্রতিহিংসা যায় না। আমি বিশ্বাস করি আমাদের যুব সমাজ পটেনশিয়াল। তারা ইনোভেটিভ এবং প্র্যাগম্যাটিক। তারা পারবে। তাই যুব সমাজের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে ইশতেহার তৈরি করেছি। এতে আছে মা ও শিশুর জন্য আইডিয়া। কৃষকদের জীবনে আমরা বিপ্লব আনতে চাই। প্রাইভেট ভেঞ্চারকে আমরা উৎসাহিত করবো। দেশি এবং বিদেশি উভয়কে। শিল্প মালিকদের আইডল হিসেবে রাখবো সামনে। শিশুর মত করে শিল্পকে নার্চার করবো। তবেই তারা দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলবো। এতে করে মালিক ও শ্রমিককে মুখোমুখি না করে সমন্বয় করবো। এছাড়া প্রফেশনাল শিক্ষার ব্যবস্থা করবো যা বেকার তৈরি করবে না। যোগ্য করে তৈরি করবে।
তিনি আরো বলেন, আমরা রা সরকার গঠন করতে পারলে সম্মান পাবে রেমিট্যান্স যোদ্ধা। সে যখন মারা যায় তার লাশ কে আনবে সেইটা নিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু হয়। আমরা সরকার গঠন করলে তাদের লাশ রাষ্ট্র আনবে। যুবক তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবো আমরা। এদিকে আমাদের সমাজের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা মানবেতর জীবনযাপনই করে না, তারা ন্যূনতম সম্মানও পায় না। চা বাগানের কর্মীদের জীবনযাপন দেখলে আপনাদের চোখে পানি চলে আসবে। আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে তাদের জীবনমানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবো। আমরা এমন সমাজ গঠন করবো যেখানে চা বাগান থেকেও দেশের প্রধানমন্ত্রী হবে ইনশাআল্লাহ। এ দেশের পাহাড় এবং সমতলের ব্যবধান ঘুচিয়ে এক করবো। সবাই আস্থার সঙ্গে মনে রাখবে এ দেশ আমার। পাহাড়ে অশান্তি আর দেখতে চাই না। এই পাহাড় রক্ষা করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর ১০ হাজার সদস্য শহিদ হয়েছেন। এর সমাধান করতে হবে যৌক্তিকভাবে।
তিনি বলেন এই ইশতেহার সামনে এগিয়ে যাওয়ার।
যে ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে তা হলো, ০১. জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ—এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ আপসহীন রাষ্ট্র গঠন (National Interest)
০২. বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন (Social Justice)
০৩. যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া (Youth First)
০৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন (Women Participation)
০৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ (Public Safety and Security)
০৬. সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন (Zero Corruption)
০৭. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন (Tech-based Society)
০৮. প্রযুক্তি, মানবসম্পদ, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি; সরকারি চাকরিতে বিনা বেতন শিক্ষানবিশ এবং বেসরকারি খাতে সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ (Widespread Employment)
০৯. ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকটের মাধ্যমে অর্থ ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও শক্ত অর্থনীতি বিনির্মাণ (Robust and Sustainable Economy)
১০. গণতান্ত্রিক (নির্বাচন) পদ্ধতির নির্বাচনের মাধ্যমে স্বচ্ছ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা (Strong and Functional Democracy)
১১. বিচার বিভাগ রাষ্ট্রীয় প্রভাবমুক্ত করা; গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা (Justice and Human Rights)
১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে (July Spirit)
১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা (Agro-Revolution)
১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘জিরো ন্যাশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্য শূন্যতা এবং কার্বন-নিঃসরণ শূন্যতা) অর্জনের মাধ্যমে সবুজ ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়া (Food Security and Environmental Sustainability)
১৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিক শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা (Industrialisation)
১৬. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানবসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা (Reasonable Salary and Hassle-free Job Environment)
১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুষ্ঠানিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা (Pro-Expatriate Approach)
১৮. সংখ্যালঘু-সংখ্যানুপাত (মেজরিটি-মাইনরিটি নয়), বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা (Inclusive Nation)
১৯. আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রদান (Universal Healthcare System) এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা
২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা (Educational Reform)
২১. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা (Provision of Necessities)
২২. যানজটমুক্ত দেশ সাজানো এবং রাজধানীর সাথে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা; দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যানজটব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা (Transport Revolution)
২৩. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা (Affordable Housing)
২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা (Reform Pro-Fascist System)
২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা (Social Security)
২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা (Welfare State)
মন্তব্য করুন