রবিবার
১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অটোগ্যাস সংকটে কক্সবাজার, অচল প্রায় সব ফিলিং স্টেশন

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম
ফিলিং স্টেশন
expand
ফিলিং স্টেশন

পর্যটন শহর কক্সবাজারে হঠাৎ করেই তীব্র আকার ধারণ করেছে এলপিজি অটোগ্যাসের সংকট। এতে জেলার প্রায় সব ফিলিং স্টেশন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। শনিবার (১৭ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে কক্সবাজার শহরের অধিকাংশ অটোগ্যাস স্টেশনে ‘গ্যাস শেষ’ লেখা নোটিশ ঝুলতে দেখা গেছে।

শুধু তাই নয়, অটোগ্যাস সংকটের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন এলাকায় রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডারও ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা দিতে রাজি হলেও অনেক গ্রাহক গ্যাস সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও দোকানগুলোতে ‘গ্যাস নেই’ বলে গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও সীমিত মজুত থাকলেও তা নির্দিষ্ট কিছু ক্রেতার জন্য গোপনে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। হোটেল-রেস্তোরাঁ, ছোট খাবারের দোকান ও আবাসিক ভবনগুলোতে রান্না কার্যত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

গত কয়েক দিন ধরে সারা দেশে এলপিজি সংকট চললেও কক্সবাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্বাভাবিক ছিল। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় হঠাৎ করেই পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। এতে অটোগ্যাসনির্ভর হাজারো পরিবহন চালক বিপাকে পড়েছেন। সংকটের এই চিত্র শুধু জেলা শহরে সীমাবদ্ধ নয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চকরিয়া, রামু, উখিয়া ও টেকনাফসহ জেলার প্রায় সব উপজেলাতেই ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস মিলছে না। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পরিবহন চালক ও সাধারণ যাত্রীরা।

শনিবার রাতে শহরের কালুর দোকান এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, গ্যাস না পেয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন নোহা মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও এলপিজিচালিত বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা।

খরুলিয়া ঘাটপাড়া এলাকার সিএনজি অটোরিকশা চালক মুরাদ বলেন, ‘হঠাৎ করেই গ্যাস না পাওয়ায় তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। শুনেছি আশপাশের কোথাও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কাল গাড়ি নিয়ে বের হতে পারব কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান উখিয়াগামী নোহা মাইক্রোবাস চালক মহিউদ্দিন। পথিমধ্যে গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ায় তিনি বিপাকে পড়েন।

মহিউদ্দিন বলেন, ‘পাম্পে এসে জানতে পারি গ্যাস নেই। মনে হয় আজ রাতে আর গন্তব্যে ফেরা হবে না। কাল সকালের ভাড়ার ট্রিপটাও মিস হয়ে যাবে। এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে আমাদের মতো চালকদের পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।’

ফিলিং স্টেশনগুলোর কর্মীরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। কালুর দোকান এলাকার একটি স্টেশনের কর্মী মোহাম্মদ রানা জানান, সকালে এলপিজি কোম্পানির একটি গাড়ি এলেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ছিল খুবই কম। ফলে অল্প সময়েই গ্যাস শেষ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘দাম বাড়েনি, কিন্তু গ্যাসই নেই। কাল গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, তা পুরোপুরি কোম্পানির গাড়ি আসার ওপর নির্ভর করছে।’

এর আগে গত ১০ জানুয়ারি রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানায়, দেশে বর্তমানে এলপিজির মোট চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৫ হাজার টন এলপিজি ব্যবহৃত হয় অটোগ্যাস হিসেবে।

সংগঠনটির নেতারা সতর্ক করে বলেন, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে অটোগ্যাস খাত মারাত্মক সংকটে পড়বে এবং এই শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে। এ জন্য তারা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।

অন্যদিকে চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সর্বশেষ দুই মাসের পরিসংখ্যানে এলপিজি আমদানি বেড়েছে। সে তুলনায় বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে দাবি করেছে মন্ত্রণালয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি মজুত রয়েছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সরবরাহ কমে যাওয়ার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকলেও বাজারে এক ধরনের অস্বচ্ছতা ও কৃত্রিম সংকটের ইঙ্গিত মিলছে। ফলে সরকারি সংস্থাগুলোর ‘পর্যাপ্ত মজুত’ সংক্রান্ত দাবির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্ন আরও গভীর করছে।

এই সংকট স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যর্থতা, নাকি পরিকল্পিত কৃত্রিম সংকট। দ্রুত সমাধান না এলে পর্যটননির্ভর কক্সবাজারে পরিবহন ব্যবস্থা আরও বড় ধরনের অচলাবস্থার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X