

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


চায়ের কাপ থেকে যে সুবাস প্রতিনিয়ত শহুরে ড্রয়িংরুম কিংবা ব্যস্ত ফুটপাতের আড্ডায় ছড়িয়ে পড়ে, তার নেপথ্যের কারিগরদের গল্প আড়ালেই থেকে যায়। কিন্তু সেই নিভৃত পাহাড়ের কোল থেকেই উঠে এসেছে এমন এক জোড়া হাত, যা এখন পুরো দেশের অহংকার। তিনি জেসমিন আক্তার। বয়স আটান্ন, কিন্তু সবুজ চা-বাগানের বুকে তাঁর আঙুলের গতি কোনো তরুণীর চেয়ে কম নয়।
১৬৮টি চা বাগানের লক্ষাধিক শ্রমিকের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে টানা তিনবার দেশের সেরা পাতা চয়নকারী নির্বাচিত হয়েছেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ইস্পাহানি গ্রুপের নেপচুন চা বাগানের এই ‘সবুজ জাদুকর’। সম্প্রতি ষষ্ঠ জাতীয় চা দিবসের প্রতিযোগিতায় মাত্র ৩০ মিনিটে ১৩ কেজি পাতা তুলে তিনি পূর্ণ করলেন হ্যাটট্রিক।
আজ থেকে ৪২ বছর আগের কথা। কুমিল্লার এক অতি সাধারণ ঘরের ১৬ বছরের কিশোরী জেসমিন যখন আবদুল বারেকের হাত ধরে ফটিকছড়ির নেপচুন চা বাগানে পা রেখেছিলেন, তখন হয়তো ভাবেননি এই পাহাড়ই একদিন তাঁর পরিচয় হবে। নতুন পরিবেশ, সম্পূর্ণ নতুন জীবন। একপাশে সংসার সামলানো, অন্যপাশে পেটের তাগিদে স্বামীর সাথে বাগানে পাতা তোলার কাজ শুরু করা।
সেই থেকে শুরু। দেখতে দেখতে চার দশক পেরিয়ে গেছে। এই ৪২ বছরে জেসমিনের হাতের রেখায় মিশে গেছে চা পাতার সবুজ রস। অথচ নিখুঁত ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ তোলার দক্ষতায় একটুও জং ধরেনি। ৫৮ বছর বয়সেও তিনি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৪৯ কেজি পাতা তুলতে পারেন। সে হিসেবে গত এক বছরে তাঁর অভিজ্ঞ হাত ছুঁয়ে গেছে ২৬ হাজার ২১৭ কেজি চা পাতা!
জেসমিন বলেন ‘টানা তিনবার দেশের সেরা হতে পারাটা আনন্দের। তবে আমার বড় তৃপ্তি হলো, আমার পুরো পরিবার এই একটি বাগানের ওপর ভর করেই বেঁচে আছে। এই সবুজ পাতার সাথেই আমাদের জীবন-মরণ।’
নেপচুন চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘জেসমিনের এই হ্যাটট্রিক জয় আমাদের পুরো বাগানের জন্য যেমন আনন্দের, দেশের জন্যও তেমনি গৌরবের।’
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ১৩টি দেশে চা রপ্তানি করছে। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫ সালে চা রপ্তানি খাত থেকে দেশের আয় হয়েছে প্রায় ২৯২ মিলিয়ন টাকা। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চায়ের যে কদর, তার মূল ভিত্তি হলো সঠিক ও মানসম্মত পাতা বাছাই। আর সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন জেসমিনের মতো লাখো নিভৃতচারী শ্রমিক।