বৃহস্পতিবার
২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রামিসা থেকে আতিকা: আতঙ্কে দেশ, প্রশ্নে নিরাপত্তা

সাইফুল্লাহ আমান
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ০৯:২১ পিএম
হত্যার শিকার শিশু রামিসা ও আতিকা
expand
হত্যার শিকার শিশু রামিসা ও আতিকা

চলতি বছর ২০২৬ সালের ৫ মাস চলছে। এরমধ্যেই বেশ কয়েকটি হৃদয়বিদারক শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক মর্মান্তিক শিশু হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং আতঙ্ক তৈরি করেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা শহর, শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর সর্বশেষ শিকার মিরপুরের ৭ বছরের শিশু রামিসা।

শিশু ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা কর্মীরা বলছেন, এসব ঘটনাকে শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখা যাবে না। বরং সমাজে সহিংসতার বিস্তার, বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা, মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এবং শিশু নিরাপত্তার দুর্বলতার প্রতিফলন এসব ঘটনা প্রকাশ করে।

চলতি মে মাসে রাজধানীর পল্লবীতে ৭ বছরের শিশু রামিসা আক্তার হত্যার ঘটনা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটি বাসার পাশের একটি ফ্ল্যাটে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরে একই ভবন থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

তদন্তে উঠে আসে, শিশুটিকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ গোপনের উদ্দেশ্যে মাথা শরীর থেকে আলাদা করে বাথরুমের বালতিতে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

ঘটনার পর রাজধানীসহ সারাদেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এ ঘটনার পরে নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রধান সন্দেহভাজনসহ দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, অপরাধীরা হত্যার পর এলাকা ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল।

মে মাসের ৮ তারিখে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় চাঞ্চল্যকর ৫ হত্যার ঘটনা ঘটে। স্ত্রী, তিন কন্যাসন্তান এবং শ্যালককে গলা কেটে ও শ্বাসরোধ করে নৃশংসভাবে হত্যা করেন ফোরকার মিঞা। পারিবারিক কলহের জেরে প্রধান অভিযুক্ত ফোরকান মোল্লা নিজেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে তদন্তে উঠে আসে। পরবর্তীতে পদ্মা নদী থেকে ফোরকানের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

এর আগে গত এপ্রিল মাসে মানিকগঞ্জে ৭ বছরের শিশু আতিকা আক্তার নিখোঁজ হয়। এরপর একটি ভুট্টা ক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, শিশুটির কানের স্বর্ণের দুল লুটের উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।

পুলিশের তথ্যমতে, অভিযুক্ত নাঈম আতিকাকে হত্যার পর স্বর্ণালঙ্কার বিক্রির চেষ্টা করে। পরে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং কিছু স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করা হয়। তবে ঘটনাটি আরও ভয়াবহ মোড় নেয়, যখন ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তের বাবা ও চাচাকে গণপিটুনি দেয়। এতে দুজন নিহত হন। পরে পুলিশ জানায়, শিশুহত্যা এবং গণপিটুনি—দুই ঘটনাই পৃথক অপরাধ হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের অনাস্থা এবং প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ভয়াবহ রূপ তুলে ধরেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়াজুল হক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতাকে দায়ী করেন।

তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘আমাদের দেশের কোনো সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। যার কারণে শিশু হত্যার মতো জঘন্যতম ঘটনা বন্ধ হয়নি। শিশু হত্যার ঘটনায় শাস্তি হিসেবে পেনাল কোডে সুস্পষ্টভাবে মৃত্যুদণ্ডের কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু এরকম হত্যা করার পরে আসামীরা চোখের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। অথচ এসব অপরাধীদের শাস্তি হলে এরকম শিশু হত্যার ঘটনা একেবারেই কমে যেত।’

এছাড়া এপ্রিল মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাবার হাতে শিশু হত্যার কয়েকটি ঘটনা সামাজিকভাবে গভীর আলোচনার জন্ম দেয়। এর মধ্যে এক ঘটনায় অভিযোগ ওঠে, বাবা বাসায় এসে চা খেতে চান। মায়ের চা দিতে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে দাম্পত্য কলহের মধ্যে বাবা নিজের কোলে থাকা শিশুকে আছাড় দেন। এতে শিশুটি মারা যায়। আরেক ঘটনায়, শিশুর কান্না থামাতে গিয়ে এক বাবা তার মুখ চেপে ধরে রাখে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, দীর্ঘসময় শ্বাসরোধের ফলে শিশুটির মৃত্যু হয়।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব ঘটনা পরিবারে সহিংস আচরণ, মানসিক চাপ, দারিদ্র্য ও রাগ নিয়ন্ত্রণহীনতার ভয়াবহ প্রভাবকে সামনে এনেছে।

এছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ময়মনসিংহে সুপারি চুরির অভিযোগ তুলে ৯ বছরের এক শিশুকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শিশুটিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই নির্যাতন চালানো হয়। এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মানবাধিকার মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।

এদিকে নরসিংদীতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী ধর্ষণের বিচার দাবি করার পর অপহরণ ও হত্যার শিকার হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

ঘটনার পর মূল আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা আত্মগোপনে চলে গেলেও পরে তাকে গাজীপুর থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ধর্ষণের শিকার বা বিচারপ্রার্থী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও কমে যাবে।

এপ্রিল মাসে কুমিল্লার একটি আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আদালত এক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

এই রায়কে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলাগুলোর দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছিলেন অধিকারকর্মীরা।

শিশু অধিকার সংগঠন ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কয়েকটি গুরুতর বাস্তবতা সামনে এনেছে। এর মধ্যে শিশু সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পরিচিত মানুষদের কাছেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি যৌন সহিংসতার পর প্রমাণ গোপনে হত্যার প্রবণতা বাড়ছে। এছাড়া খুব সম্প্রতি পারিবারিক সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, যার ফলে শিশু সন্তান হত্যার ঘটনা বেড়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বিচার হয় না কিংবা হলেও অনেক বছর ধরে চলতে থাকে বিচারকার্য। এর মধ্যে আসামীরা জামিনে বের হয়ে পালিয়ে যায়। এমন ধারণা থেকে গণপিটুনির প্রবণতা বেড়েছে সাধারণ মানুষের।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন