সোমবার
২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৬ কোটি টাকার টিস্যু ভবন যেন সময়ের 'বোমা'!

বান্দরবান প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ০৬:০১ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি
  • ফাউন্ডেশন কাঠামো নিরাপদ এবং টেকসই কিনা যাচাইয়ের জন্য করা হয়নি 'পাইল লোড টেস্ট'
  • ভূমিকম্পে ভবনটি পড়তে পারে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে
  • চার তলা ভবন নির্মাণে অত্যধিক ব্যয় অসঙ্গতিপূর্ণ মনে করছেন স্থানীয়রা

পাহাড়ি কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বাড়াতে বান্দরবানে নির্মিত হচ্ছে বিশ্বমানের আধুনিক প্লান্ট টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি। সাঙ্গু নদীর তীর ঘেঁষে গোলাকার আকৃতির তথাকথিত আধুনিক এ ভবন নির্মাণের শুরুতে যথাযথ মাটি পরীক্ষা এবং নির্মাণকালীন পর্যাপ্ত লোড টেস্ট হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ছিল না স্বচ্ছতা। ফলে ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে এমনটা আশঙ্কা স্থানীয়দের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চোখ ধাঁধানো নান্দনিকতার আধুনিক এ ভবন ডিজাইনের পেছনে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের একটি কৌশল প্রকল্প পরিচালকের। এছাড়াও প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, স্থান নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে এরই মধ্যে উঠতে শুরু করেছে প্রশ্ন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বান্দরবান শহরের বালাঘাটার হর্টিকালচার সেন্টারে নির্মিত গোলাকার আকৃতির চারতলা বিশিষ্ট ভবনের কাজ শেষে এখন কাচ বসানো ও বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ চলছে। প্রকল্পের সাইট ইঞ্জিনিয়ার নোবেল চাকমা জানিয়েছেন, চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যেই ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী হবে।

প্রকল্পের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন প্রকল্পের আওতায় ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হয়। যদিও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষে কাজটি তদারকি করছে জয়েন্ট ভেঞ্চার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিকন। যৌথ উদ্যোগে কাজটি বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমবি-ইসি। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নান্দনিকতার এ ভবন নির্মাণের শুরু থেকেই ছিল না কোনো জবাবদিহিতা। এ ভবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ফাউন্ডেশন কাঠামো নিরাপদ এবং টেকসই কিনা যাচাইয়ের জন্য 'পাইল লোড টেস্ট'। আধুনিক কিংবা বহুতল ভবন নির্মাণে এ লোড টেস্ট করা বাধ্যতামূলক হলেও তা করেনি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। ফলে বড় ধরনে দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

বালাঘাটার বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, ভবনটি বাইরের দিকটা কত সুন্দর দেখতে। কিন্তু শুরু থেকেই নির্মাণ কাজে অনিয়ম করা হয়েছে। এমনিতেই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে নদীর তীরবর্তী স্থানে। এরমধ্যে পাইলিং এর পর সেখানে বালু ভরাট না করে, করা হয়েছে মাটি ভরাট। আর লোড টেস্ট করতে দেখিনি আমরা। এ ভবনটি কি টেকসই হবে তো, এমন প্রশ্ন তার।

এলাকার আরেক বাসিন্দা মনসুর আলী বলেন, গতবছর পাইলিং এর কাজ করার সময় বৃষ্টি ছিল। ঢালাইয়ের কাজে ব্যবহৃত পাথরের কংকরগুলো মাটি সাথে মিশে একাকার। এভাবেই চলছিল ঢালাই। আর এ প্রকল্পের যে সাইট ইঞ্জিনিয়ার ছিল, সে তো নামে মাত্র দায়িত্ব পালন করেছে। তার কোন ভূমিকা আমরা দেখিনি।

ঠিকাদার আব্দুল মান্নানসহ বেশ কয়েকজন ঠিকাদার বলেন, আধুনিক মানের একটি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অবশ্যই অবশ্যই লোড টেস্ট করতে হবে। এছাড়াও সিডিউল অনুযায়ী ভালো মানের রড ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু এ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শুরু থেকে নানা অনিয়মের কথা শুনেছি।

তিনি আরও বলেন, হর্টিকালচার সেন্টারের ভিতরে এত বিশাল টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ কোন দরকার ছিল না। দৃষ্টিনন্দন নকশা বা বিলাসবহুল উপকরণের কথা বলে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় মাত্রাতিরিক্তভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজেদের পকেট উন্নয়নের জন্যই সরকারি টাকা অপচয় করছে।

এদিকে, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এর সাবেক ছাত্র আমেরিকা প্রবাসী সত্যজিৎ রায় বলেন, বহুতল ভবন নির্মাণে ক্ষেত্রে পাইলিং এর কাজ শেষে স্থাপনার নকশা এবং কাঠামোর ধরণ অনুযায়ী নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী লোড টেস্ট করতে হয়। টেস্টের ফলাফল ঠিক থাকলে ভবন সম্প্রসারণে কাজ শুরু হয়। বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ছাড়া ভবনের ভিত্তি কতটা নিরাপদ, তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। অন্যথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পরতে পারে ভবনটি।

অভিযোগ আছে, চোখ ধাঁধানো নান্দনিকতার আধুনিক এ ভবন ডিজাইনের পেছনে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের কৌশল প্রকল্প পরিচালক তালহা যুবাযের মাসরুর'র নিজের পকেটের উন্নয়নের জন্যই দৃষ্টিনন্দন নকশা বা বিলাসবহুল উপকরণের কথা বলে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় মাত্রাতিরিক্তভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

তথ্য বলছে, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য এর আগেও ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি হিমাগার। এটি বর্তমানে পড়ে আছে অকার্যকর অবস্থায়। কাজে আসেনি কৃষক ও ব্যাবসায়ীদের। ফলে নতুন এই প্রকল্পটিও। শেষ পর্যন্ত একই পরিণতির মুখে পড়বে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন অনেকেই।

বান্দরবান জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অংচমং মারমা বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা করেন না। এ কারণে অনেক অনিয়ম চাপা পড়ে যায়। ফলে জনগণের কোটি কোটি টাকার প্রকল্পেও কাঠামোগত নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সরকারি অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভবনে যদি নীতিমালা অনুসরণ না করা হয়, তাহলে তা শুধু অর্থের অপচয় নয়, মানুষের জীবনের জন্যও নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে জানান তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চার তলা ভবন নির্মাণে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা ব্যয় এটা অতিরিক্ত। এটি মূলত ঠিকাদার আর প্রকল্প পরিচালক মিলেমিশে ভাগ-বাটোয়ারা করার জন্যই প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে। তাছাড়া প্রকল্প পরিচালক ও কাজটির তদারকির দায়িত্বে যারা রয়েছেন তারা ঢাকায় থাকেন, নিয়মিত কাজের জায়গায় আসেন না। তাই কনস্ট্রাকশন ফার্মের লোকদের ম্যানেজ করে ইচ্ছেমত কাজ সম্পাদন করছেন ঠিকাদার।

তবে কাজের বিষয়ে ঠিকাদার মোজাফফর বলেন, সিডিউল অনুযায়ী ‘নিয়ম মেনে সব কাজ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের লোক সার্বক্ষণিক কাজের সাইডে আছেন'। এখানে কোন অনিয়ম হয়নি।

বান্দরবানের বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক লিটন দেবনাথের কাছে টিস্যুকালচার ভবন নির্মাণে লোড টেস্ট করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব আমি জানি না। কোথায় কি অনিয়ম হয়েছে তা আমি কিছুই বলতে পারবো না বলে সাফ জানিয়ে দেন।

এ বিষয়ে টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবায়ের মাসরুর সাথে ভবন নির্মাণে কাজের মান, অতিরিক্ত ব্যয় ও লোড টেস্টের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রথমে বক্তব্য দিতে চাননি। পরে তিনি বলেন, আমরা কনস্ট্রাকশন ফার্ম নিয়োগ করেছি, তারা সার্বক্ষনিক দায়িত্বে ছিল। এক পর্যায়ে তথাকথিত আধুনিক এ ভবনের নানা সুবিধার কথা বর্ণনা করে শোনালেও কাজের মান ও লোড টেস্টের বিষয়টি বার বার এড়িয়ে গেছেন তিনি।

বাহ্যিক দৃষ্টিনন্দন আধুনিক প্লান্ট টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি ভবন নির্মাণে অত্যধিক ব্যয়, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারসহ অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন স্থানীয়রা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
LIVE
Belgium VS Iran
54'
0 - 0
World Cup