বুধবার
০৬ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৬ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুন্দরবনে বাড়ছে বনদস্যু 

বাগেরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬, ০৪:২২ পিএম
বনদস্যু বাহিনী
expand
বনদস্যু বাহিনী

১৬ বছর ধরে সুন্দরবনের বুকে দস্যুতা করে বেড়িয়েছেন। ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ করে ফিরে আসেন স্বাভাবিক জীবনে। তবে নতুন জীবনও দিন দিন দূর্বিষহ হয়ে উঠছে বলে জানান বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার শ্রীফলতলা এলাকার পঞ্চাশোর্ধ্ব সাব্বির শেখ।

তিনি বলেন, সুন্দরবনে ডাকাতিতে টাকা ছিল, কিন্তু শান্তি ছিল না। অভিযানে ধরা পড়ার ভয় ও মৃত্যুঝুঁকি সব সময় তাড়িয়ে বেড়াত। অবৈধ ওই টাকায় পরিবারও কখনও শান্তিতে ছিল না। এলাকাবাসীর লাঞ্চনা ও কটু কথা শুনে বাঁচতে হতো।

তিনি আরও বলেন, আমি একসময় জুলফিকার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলাম। মামলা উঠিয়ে নিবে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে এমন বিভিন্ন আশ্বাসে আমরা আত্মসমর্পণ করি। কিন্তু এখনও আমার তিনটি মামলা রয়েছে। আর যে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে সেটাও পর্যাপ্ত নয়। মামলার খরচ ও চিকিৎসা খরচ মেটাতে বাপের জায়গাটুকুও বিক্রি করছি। এখন আমাদের একমাত্র সমস্যা হলো ক্ষুদা। তিন বেলা খাইতে পারিনা। তিনবেলা খাইতে না পারলেও সুখে আছি। তবে অনেকে মামলার চাপে আর ক্ষুদার যন্ত্রণায় আত্মসমর্পণকারী বনদস্যুরা আবারও সুন্দরবনে যাচ্ছে।

বন বিভাগ জানায়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে সুন্দরবনের ৩২টি দস্যু বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করে। ৩২টি দস্যু বাহিনীর মোট ৩২৮ জন দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫৯৩টি গুলিসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন।

তবে আবারও ভয়ংকর হচ্ছে সুন্দরবন। দস্যুতায় ফিরছেন আত্মসমর্পণকারী দলগুলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মসমর্পণকারী জেলেদের সরকারের সব ধরণের সহযোগিতা ও পুনর্বাসনে নানামুখী পদক্ষেপের আশ্বাস দিলেও কার্যকর তেমন কিছুই দেখা যায়নি। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল পুনর্বাসন ও মামলার চাপে অনেকেই ফিরছেন পুরানো পেশায়। একই দাবি আত্মসমর্পণকারীদের।

আত্মসমর্পণকারী বনদস্যু কামাল শিকারী বলেন, মামলায় হাজিরা দিতে দিতেই জীবন শেষ। ২০১৮ সালে আমি আত্মসমর্পণ করি। সরকার ৩ মাসের মধ্যে আমাদের কেস মামলাগুলো শেষ (নিষ্পত্তি) করে দেওয়ার কথা বলে। সেই অনুযায়ী আমরা অস্ত্রসহ র‍্যাব-৬ এর কাছে আত্মসমর্পণ করি। সেসময় কিছু কিছু লোকের মামলাগুলো শেষ (নিষ্পত্তি) করছে। কিন্তু আমাদের কিছু লোকের মামলা এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি। আমাদের মামলার হাজিরা দিতে হচ্ছে। আমরা এই মামলার খরচের জন্য অনেক কষ্টের মধ্যে জীবন যাপন করছি। অনেকেই হয়তো এই কষ্টের জন্যই সুন্দরবনে আবার ডাকাতি করতে নেমে গেছে।

তিনি আরও বলেন, যতই কষ্ট হোক, আমি আর সুন্দরবন যাব না। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি আমার মামলা উঠিয়ে নিলে আমরা পরিবার নিয়ে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে পারব।

আত্মসমর্পণকারী বনদস্যু মো সোলাইমান বলেন, আমাদের বলা হয়েছিল আত্মসমর্পণ করার তিন মাসের মধ্যে সব মামলা ক্লোজ করে দেওয়া হবে। সব মামলা সরকারি অর্থায়নে নিষ্পত্তি করা হবে কিন্তু সেরকম কিছুই হয়নি। মামলাগুলো সম্পুর্ণ ব্যক্তিগত অর্থায়নে চালিয়ে নিতে হচ্ছে। সরকার আরও আশ্বাস দিয়েছিল যে, আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরলে কোনো ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হলে সরকার আমাদের সাহায্য করবে। প্রশাসন আমাদের অগ্রাধিকার দিবে। আসলে এরকম কিছুই হচ্ছে না। দৈনিক পাঁচশত বা ১ হাজার টাকা আয় করে মাসে ত্রিশ চল্লিশ হাজার টাকার মামলা চালানো তো সম্ভব না। বাধ্য হয়েই অনেকে হয়তো আবার সুন্দরবন যাচ্ছে। আত্মসমর্পণকারী বনদস্যু যারা এখন আবার সুন্দরবন গেছে তাদের হয়তো আমার চেয়ে বেশি মামলার চাপ আছে।

তিনি আরও বলেন, বারো তেরো বছর বয়সেই আমি সুন্দরবনে যায়। সাত বছরের মত সেখানে ছিলাম। পরে আমি আত্মসমর্পণ করি। আমি এখন খেয়ে থাকি আর না খেয়ে থাকি তারপরও উপর আল্লাহর ইচ্ছায় খুব শান্তিতে আছি। সুন্দরবনে যাওয়ার আর কোনো ইচ্ছা নেই। কিন্তু যারা গেছে তাদের হয়তো দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বলে আবার সুন্দরবনে ডাকাতি করতে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বনদস্যু জানান, এক মামলা থেকে বাঁচতে সুন্দরবন এসে এখন তিন চারটা মামলার আসামী আমি। আমার মত অনেকেই আছে মামলা থেকে বাঁচতে এসে এখন ঘাড়ে আরও বেশি মামলার চাপ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনোভাবেই আর আমাদের বাঁচার উপায় নেই। সরকার চাইলে আমরা অনেকেই আছি যে আত্মসমর্পণ করবো।

কোস্টগার্ড সূত্রে জানাযায়, গত দেড় বছরে করিম-শরীফ, নানা ভাই, ছোট সুমন, আলিফ ও আসাবুর বাহিনীসহ বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর সর্বমোট ৬১ জন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এসময় ৮০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৯৯ রাউন্ড তাজা গোলাবারুদসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার এবং ৭৮ জন জেলে ও ৩ জন পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় এর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় বনদস্যুদের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। এ প্রেক্ষিতে আমরা বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে যৌথ অভিযান “অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন”এবং "অপারেশন ম্যানগ্রোভ শীল্ড" পরিচালনা করেছি। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা ও জেলে, বাওয়ালিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কোস্ট গার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সুন্দরবন সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কোস্ট গার্ডের এই সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সাধারণ সম্পাদক এস কে এ হাসিব বলেন, তৎকালীন সরকার আত্মসমর্পণকারী বনদস্যুদের পুনর্বাসন ও মামলার নিষ্পত্তির বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেটা সরকারকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আত্মসমর্পণকারী বনদস্যুদের যদি এখনও মামলার জন্য আদালতে হাজিরা দিতে হয় বা পর্যাপ্ত পুনর্বাসনের সুবিধা তারা না পান তাহলে তারা আবারও পুরানো পেশায় ফিরে যেতে পারে। প্রশাসনকে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন বলেন, ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণকারী বনদস্যুদের প্রত্যেককে ১ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে, তারা যদি আমাদের নিকট কোনো আবেদন করে তাহলে আমরা তাদের দাবি দাওয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করতে পারি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেভাবে সিদ্ধান্ত নিবে সে অনুযায়ী তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, অনেক বনদস্যু আত্মসমর্পণ করার জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। আমরা এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছি না। কারণ একজন অন্যায় করবে আর রাষ্ট্র বারবার তাকে সুযোগ দিবে। বিষয়টা ঠিক না। বনদস্যুরা যে অপরাধ করছে তাদের হয়তো সেখান থেকে সরে আসতে হবে নাহয় আমাদের যে অভিযান তাদের তা মোকাবেলা করতে হবে। আমরা ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছি। প্রতিনিয়ত অভিযান চলছে। আমরা প্রয়োজনে কৌশল পরিবর্তন করে তাদের গ্রেফতার করার ব্যবস্থা করব। যেকোনো মূল্যে আমরা সুন্দরবনকে দস্যু মুক্ত করব। যাতে উপকূলের সাধারণ মানুষ তাদের জীবন জীবিকার জন্য সুন্দরবনে যেতে পারে।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী সুন্দরবনে বর্তমানে ৮ থেকে ১০টি দলে শতাধিক দস্যু যুক্ত রয়েছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন