

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


নিখোঁজ হওয়ার ৪৮ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো সন্ধান মেলেনি ঠাকুরগাঁওয়ের সেই তিন মাদরাসা ছাত্রীর। প্রায় দুই মাস হতে চললেও সন্ধান না পাওয়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন নিখোঁজ জান্নাতুল ফেরদৌস তামান্না, আয়শা সিদ্দিকা হাসি ও জুঁইয়ের মা–বাবা। তারা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত প্রায়, তবুও মিলছে না কোনো সান্ত্বনা কিংবা নিশ্চিত খবর।
নিখোঁজদের পরিবার বলছে, “আমরা থানায় গিয়েছি, প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি, কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না। পুলিশ শুধু বলছে তদন্ত চলছে। ৪৮ দিনেও মেয়েদের খোঁজ না মেলায় আমরা হতাশ। আমাদের মেয়েরা কী করছে, কেমন আছে, আল্লাহই ভালো জানেন। আমরা আমাদের সন্তানদের ফেরত চাই।”
গত (৯ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে তামান্না, আয়শা ও জুঁই ঠাকুরগাঁও সদরের মাদরাসা পাড়ার “আয়েশা সিদ্দিকা” মাদরাসা থেকে বের হয়। এরপর শহরের বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, নিখোঁজ তিন ছাত্রী রাত ১টার সময় একটি রিকশায় করে প্রথমে ঠাকুরগাঁও বাসস্ট্যান্ডে যান। এরপর রিকশা বদল করে তারা ঠাকুরগাঁও রেলস্টেশনে যান। তবে সেই রাতে কোনো ট্রেন না পেয়ে তারা রোড আবাসিক হোটেলে ভোর ৪টা পর্যন্ত অবস্থান করেন। পরে হোটেল ম্যানেজারের সাহায্যে তারা স্টেশনে গিয়ে কিছু সময় অপেক্ষা করে রোড অটোস্ট্যান্ডে ফিরে যান এবং ঠাকুরগাঁও পীরগঞ্জের উদ্দেশ্যে একটি অটোরিকশা নিয়ে রওনা হন। এরপর থেকেই তাদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। এ ঘটনায় ওই রাতেই ঠাকুরগাঁও সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
মাদরাসা সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ সেপ্টেম্বর রাত ১২টার দিকে সর্বশেষ মাদরাসায় দেখা যায় নিখোঁজ তিন ছাত্রীকে। এরপর ভোর ৫টার সময় তাদের ডাকতে তাদের রুমে গেলে আর পাওয়া যায়নি। পরে মাদরাসার দোতলার বারান্দায় মাছ ধরার জাল ঝুলন্ত অবস্থায় বাধা দেখতে পেয়ে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ধারণা করেন, তারা পালিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে রোড আবাসিক হোটেলের ম্যানেজার আসাদুজ্জামান ইমন বলেন, “রাত ২টার দিকে তিনজন মেয়ে এসে বলেন তারা হোটেলে কিছুক্ষণ থাকবেন, এরপর ভোর রাতেই আবার বেরিয়ে যাবেন। পরে আমি তাদের ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে তুলে দিই।” তবে যারা ওই হোটেলে রাত্রিযাপন করেন, তাদের নাম–ঠিকানা রেজিস্টার খাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখা হয় না বলে অভিযোগ উঠেছে হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
নিখোঁজ তামান্নার মা আখলিমা বেগম বলেন, “মাদরাসায় অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে, তবুও কর্তৃপক্ষ মাদরাসা ভবনে কোনো প্রকার নিরাপত্তা প্রহরী রাখেনি। তাদের ভবনের বারান্দায় কোনো গ্রিল নেই, ফলে সহজেই কেউ চাইলে ভবনের ভেতরে বা বাইরে যেতে পারে। আমরা তো আমাদের মেয়েদের তাদের ভরসায় সেখানে রেখেছিলাম।”
নিখোঁজ আয়শার বোন লাবনী বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মারধর করে নির্যাতন করত। আমার বোন নিখোঁজ হওয়ার কিছুদিন আগে আমাদের এই নির্যাতনের কথা জানিয়েছিল এবং দ্রুতই সেখান থেকে নিয়ে আসতে বলেছিল। তবে আমরা নিয়ে আসিনি, যার ফলে আজ আমার বোনকে হারাতে হলো। আমি নিশ্চিত, মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত নির্যাতনের কারণেই এই তিন মেয়ে পালিয়ে গেছে।”
অন্যদিকে, নিখোঁজের ঘটনায় মাদরাসার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। কীভাবে তারা মাদরাসার দুইতলা ভবন থেকে পালাল— এমন প্রশ্নের জবাবে মাদরাসার দায়িত্বে থাকা শিক্ষিকা লাভলী আক্তার বলেন, “আমরা বুঝতে পারিনি এত তাড়াতাড়ি এমন একটা ঘটনা ঘটে যাবে। আমরা মাদরাসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছিলাম। তবে আমার বিরুদ্ধে যে নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটা ভিত্তিহীন। ওই তিন ছাত্রী গভীর রাতে স্টোর রুমের জানালার গ্রিলে মাছ ধরার জাল বেঁধে নিচে নেমে পালিয়ে যায়। ওই পাশে ছাত্রীদের যাওয়া নিষেধ ছিল, কিন্তু তারা বাধা উপেক্ষা করেই প্রায়ই স্টোর রুমের দিকে যেত। সেদিন রাতেও সেদিক দিয়েই পালিয়েছে।”
নিখোঁজ তিন ছাত্রীকে উদ্ধারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা সংস্থা কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, “তিন শিক্ষার্থী নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তাদের খুঁজে বের করতে প্রশাসনের সব সংস্থাই কাজ করছে। শিগগিরই তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।”
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, “ওই তিন ছাত্রী নিখোঁজ হওয়ার পরপরই এডিসি শিক্ষা ও এডিএমসহ পুলিশ সুপারকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি তাদের খুঁজে বের করার।”
নিখোঁজ তিন কন্যা হলো—দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার মুরারিপুর গ্রামের শাহজালালের মেয়ে জুঁই (১৪), একই উপজেলার গণকপাইনর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস তামান্না (১৬) এবং ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার গোবিন্দনগর এলাকার রবিউলের মেয়ে আয়শা সিদ্দিকা হাসি (১৩)। তারা ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর মাদরাসা পাড়া এলাকায় অবস্থিত ‘আয়শা সিদ্দিকা বালিকা মাদরাসা’র ছাত্রী।
এদিকে, সন্তানদের হারিয়ে দিশেহারা মা–বাবারা। নিখোঁজের ৪৮ দিন পেরিয়ে গেলেও যখন প্রশাসনের কোনো অগ্রগতি নেই, তখন প্রশ্ন উঠছে— কোথায় হারিয়ে গেল এই তিন কন্যা? আর কবে মিলবে তাদের সন্ধান?
মন্তব্য করুন