

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


মানচিত্রে সীমান্তরেখা থাকলেও মানুষের সম্পর্ক, আত্মীয়তা কিংবা আবেগ থেমে থাকে না। সেটাই আবারও দেখা গেল লালমনিরহাটের ধরলা নদীর তীরে, যেখানে অনুষ্ঠিত হলো ‘সীমান্ত মিলন মেলা’।
বহু বছরের পুরোনো এ আয়োজনে এবার সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি করে দুই বোনের পুনর্মিলন, দীর্ঘ ১০ বছর পর।
বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার বাসিন্দা শুসিলা রানী (৬০) এই দিনে দেখা পান তার ছোট বোন, ভারতের কোচবিহারে বসবাসকারী নিয়তি রানীর (৫০)।
অনেক বছর ধরে শুধু ফোনেই যোগাযোগ ছিল—কিন্তু সামনাসামনি দেখার এই মুহূর্তে তাদের চোখ ভিজে যায়, গলা ধরে আসে, বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন দু’জনই। চোখের জলে, বুকে জড়িয়ে ধরে—সেই চিরায়ত বোনত্বের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় রচিত হয় সীমান্তরেখার ওপারে।
রবিবার, ১৯ অক্টোবর, ধরলার ধারে বাংলাদেশ অংশের দুর্গাপুর ও মোগলহাট এবং ভারতের মোগলহাট সীমান্তের ৯২৭ নম্বর পিলার এলাকায় আয়োজিত হয় এই মিলনমেলা।
পঞ্চাশ বছরের পুরনো এই মেলার মূলকেন্দ্র শ্রী শ্রী মা বৃদ্ধেশ্বরী দেবীর পূজা হলেও, এটি কেবল ধর্মীয় আয়োজন নয়—বরং দুই বাংলার মানুষের আত্মিক মিলনের এক অনন্য উৎসব।
এই মিলনমেলার একটি বিশেষ দিক হলো—এখানে পূজা পরিচালনায় অংশ নেন দুই দেশের মানুষ।
বাংলাদেশ থেকে আসেন মন্দিরের পুরোহিত, আর ভারতের ভক্তরা পালন করেন পূজারীর দায়িত্ব। এই পারস্পরিক সহায়তা দুই দেশের ধর্মভিত্তিক সৌহার্দ্যের এক অসাধারণ নিদর্শন।
বাংলাদেশ থেকে আগত পুরোহিত বিকাশ চন্দ্র চক্রবর্তী জানান, এখানে প্রতি বছর অসংখ্য ভক্ত আসেন, কারও কেউ নেই—তবুও সবাই যেন আত্মীয়। ধর্মের বাঁধন ছাড়িয়ে এই পূজায় থাকে এক অভিন্ন ভালোবাসা।
ভারতীয় পূজারী জ্যোতিষ চন্দ্র রায় বলেন, “পুরোহিত এপারে, পূজারী ওপারে—এই মিলনই তো সম্প্রীতির প্রকৃত চিত্র। মন্দিরের সব কর্মকাণ্ডই চলে দুই দেশের মানুষের সহযোগিতায়।”
এ বছর প্রায় ২০ হাজার ভক্ত অংশ নিয়েছেন এই আয়োজনে। অনেকে এসেছেন শুধু আপনজনের মুখ দেখতে, কেউ আবার শুধুই সেই অদ্ভুত অনুভূতির অংশ হতে।
শুসিলা রানী বলেন, ফোনে কথা হইত, কিন্তু বুকের ভেতরের কষ্ট থাকতই। আজ বোনরে চোখের সামনে দেখলাম, বুকটা জুড়ায়া গেল। বড় বোনের জন্য নিয়তি রানী এনেছেন মিষ্টি, মসলা ও শাড়ি, আর শুসিলা রানী সঙ্গে এনেছেন ইলিশ মাছ আর টাঙ্গাইলের শাড়ি। এই উপহার আদান-প্রদানও ছিল চোখ ভেজানো মুহূর্তে ভরা।
নিয়তি রানী বলেন, তিন দশক আগেই ভারতে চলে আসছি। বাংলাদেশে খালি দিদি আছে। কতবার মনে হইছে দৌড়ায়ে গিয়া জড়ায়ে ধরি। আজ তা পারছি।
এই মেলাকে ঘিরে শুধু আত্মীয়দের দেখা নয়—স্থানীয় মানুষের মধ্যেও এটি দারুণ আবেগের জায়গা তৈরি করে রেখেছে। লালমনিরহাটের মোগলহাট এলাকার বাসিন্দা প্রশান্ত সেন বলেন, “ভিসা তো এখন বন্ধ। তাই এই মেলাই একমাত্র সুযোগ হয়ে থাকে আপনজনের দেখা পাওয়ার।”
রংপুরের সুধীর চন্দ্র গুপ্ত বলেন, যাবতীয় কষ্ট আর সীমাবদ্ধতা ভুলে মানুষ এখানে আসে। কাঁদে, কিন্তু সেই কান্নায় থাকে ভালোবাসা, মুক্তির স্বাদ।
সকালে সূর্য ওঠার পর শুরু হয় পূজা ও মেলার আনুষ্ঠানিকতা, শেষ হয় সন্ধ্যার আগেই। সীমান্তের দুই পক্ষ—বাংলাদেশের বিজিবি এবং ভারতের বিএসএফ—কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও এই বিশেষ দিনে আবেগের বাঁধ ভাঙে প্রতিবারের মতো।
লালমনিরহাট ১৫ বিজিবির অধিনায়ক মেজর মেহেদী ইমাম বলেন, প্রথাগতভাবেই এ আয়োজন হয়ে আসছে। আমরা এই সময়ে সীমান্তে টহল জোরদার করি যাতে সকলে নিরাপদে মেলায় অংশ নিতে পারে।
সীমান্ত কখনো কখনো মানুষকে আলাদা করে ঠিকই, তবে ভালোবাসা, আত্মীয়তা আর ধর্মীয় বিশ্বাসের সেতুবন্ধন এমন এক শক্তি—যা সে রেখাকে অতিক্রম করে যায়।
ধরলার পাড়ে দুই বোনের দেখা কিংবা দুই দেশের ভক্তদের পূজার বন্দনা—এই সবই স্মরণ করিয়ে দেয়, আমরা সবাই আসলে একই স্রোতের যাত্রী। যেখানে সীমান্ত কেবল মানচিত্রে, কিন্তু হৃদয়ের মানচিত্রে আমরা এক হয়ে আছি।
মন্তব্য করুন
