

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রাত পেরোলেই কক্সবাজারের টেকনাফের সাবরাংয়ের সাগরপাড়ে শুরু হয় এক ভিন্ন জগৎ, যেখানে ঢেউয়ের শব্দের আড়ালে কোটি কোটি টাকার ইয়াবার লেনদেন হয়।
এই জগতের একমাত্র শাসক হলেন ‘মাদক সম্রাট’ জুবাইর, যার নাম টেকনাফজুড়ে ভয় ও প্রভাবের প্রতীক হিসেবে উচ্চারিত হয়। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসে, আর এখান থেকে তা দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
দীর্ঘ গোয়েন্দা নজরদারির পর অবশেষে বিজিবি যখন জুবাইরের বিলাসবহুল প্রাসাদের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা মাদক সাম্রাজ্যের অন্ধকার অধ্যায় উন্মোচিত হয়।
মাদক চক্রের গডফাদার হিসেবে পরিচিত জুবাইরের (৪০) বাড়িতে টানা আট ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালায় বিজিবি। বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) রাতভর সাবরাং ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়ায় পরিচালিত অভিযানে উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, নগদ অর্থ, দেশি অস্ত্র এবং চোরাচালান কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম।
অভিযান চলাকালে দেয়াল টপকে পালানোর সময় জুবাইরের সহযোগী আইয়ুব আলী (৩৭) এবং বাড়ির ভেতরে আত্মগোপনে থাকা জুবাইরের স্ত্রী ফাইজা (১৯) আটক হন। তবে মূল হোতা জুবাইর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাবরাং মণ্ডলপাড়ার এই বাড়িটি দীর্ঘদিন গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, জুবাইর সীমান্তপথে ইয়াবা ও চোরাচালানের সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে অর্ধশতাধিক বিজিবি সদস্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিশেষ অভিযান চালান।
বাড়িটি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে তল্লাশি করা হয়। প্রায় ৮ ঘণ্টার অভিযান শেষে উদ্ধার হয় ১৯ হাজার ইয়াবা, নগদ ১০ লাখ ৩০ হাজার টাকা, দেশি অস্ত্র, ওয়াকিটকি, সিসি ক্যামেরা ও চোরাচালান সরঞ্জাম।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, জুবাইরের বাড়িটি আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বিলাসবহুল স্থাপনায় তৈরি। চারপাশে উঁচু দেয়াল, সিসি ক্যামেরা, ওয়াকিটকি সংযোগ এবং একাধিক গোপন পথ ছিল পাহারার জন্য। বাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ ও যোগাযোগ ডিভাইস সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচারের সময় সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় ব্যবহৃত হতো।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জুবাইর একসময় সীমান্তে রোহিঙ্গা পাচার ও দালাল চক্রে যুক্ত ছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ধীরে ধীরে মাদক বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ ও নাফ নদ সংলগ্ন এলাকায় তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিদিনই লাখ লাখ টাকার ইয়াবা আসত ও দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়াতো। বহু বছরের প্রশাসনিক নথিতেও তার নাম থাকলেও স্থানীয় প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার পর অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, নগদ অর্থ ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আটক দুজনকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দিয়ে থানায় হস্তান্তর করা হবে। মূল অভিযুক্ত জুবাইরকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
সাবরাং মণ্ডলপাড়ার এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “জুবাইরের বাড়ির চারপাশে অচেনা লোকজনের আনাগোনা নিয়মিত ছিল। কেউ কিছু বললেই ভয় দেখানো হতো। বিজিবির এই অভিযান এলাকায় অন্তত স্বস্তির নিঃশ্বাস এনেছে।”
মন্তব্য করুন