

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


কক্সবাজারের রামুতে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে ধর্মগ্রন্থ অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ভয়াবহ হামলার ঘটনায় আলোচিত উত্তম বড়ুয়ার খোঁজ মিলেছে ১৩ বছর পর।
ফ্রান্সের একটি বিমানবন্দরের লাউঞ্জে স্ত্রী রীতা বড়ুয়া ও একমাত্র ছেলে আদিত্যকে সঙ্গে নিয়ে তোলা তাঁর একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করেছেন এ কে এম আতিকুজ্জামান নামের এক নেটিজেন।
তিনি লিখেছেন, “উত্তম হারিয়ে গিয়েছিল। ১৩ বছর ১৩ দিন পর অবশেষে তাঁর খোঁজ পেল পৃথিবী।” রামু হামলার পর থেকে পলাতক থাকা উত্তম বড়ুয়ার স্ত্রী রীতা বড়ুয়া দীর্ঘ এই সময়ে একমাত্র সন্তানকে নিয়ে জীবনের কঠিন লড়াই চালিয়ে গেছেন। তাঁদের সন্তান আদিত্য সম্প্রতি এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে ফেসবুকে উত্তম বড়ুয়া নামে এক যুবকের আইডি থেকে পবিত্র কোরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এর জেরে রামুতে ১২টি বৌদ্ধবিহার ও ২৬টি ঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়। পরদিন উখিয়া ও টেকনাফেও আরও সাতটি বৌদ্ধবিহার পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রামু, উখিয়া ও টেকনাফে মোট ১৯টি মামলা হয়, যার মধ্যে ১৮টি এখনও বিচারাধীন। প্রায় ৯০০ আসামি ও ১৬০ জন সাক্ষী থাকলেও সাক্ষ্য না আসায় মামলাগুলো একযুগ ধরে ঝুলে আছে। তিনটি মামলা পুনঃতদন্তের জন্য পিবিআইয়ের কাছে রয়েছে।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতি হয়েছে। রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের প্রধান প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, “২০১২ সাল থেকে এখনো একটি মামলারও বিচার হয়নি—এটি বড় হতাশাজনক।”
তিনি বলেন, “রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হঠাৎ করে উত্তম বড়ুয়া তাঁর স্ত্রী ও সন্তানসহ একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে দেখেছি। তবে তাঁরা এখন কোথায় আছে সে ব্যাপারে বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।”
রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিপুল বড়ুয়া জানান, “হামলায় জড়িতরা কোনো ধর্মের হতে পারে না। আমরা দ্রুত পুনঃতদন্ত ও প্রকৃত দোষীদের শাস্তি চাই।”
এদিকে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) সিরাজুল ইসলামের কাছে উত্তম বড়ুয়াকে পরিবার সহ ফ্রান্সে দেখা যাওয়ার বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, “বিষয়টি আমি জানিনা ও নজরেও আসেনি। তবে খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।”
স্থানীয়রা জানান, একযুগের ব্যবধানে রামুর পুড়ে যাওয়া বিহারগুলো দৃষ্টিনন্দনভাবে পুনর্নির্মিত হয়েছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরেছে। তবে সাক্ষীরা এখনও ভয়ের কারণে সাক্ষ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
প্রতিবছর ২৯ সেপ্টেম্বরকে ঘিরে বৌদ্ধ সম্প্রদায় নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে বুদ্ধ উপাসনা, পতাকা উত্তোলন, অষ্টশীল গ্রহণ এবং প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী।
২০১২ সালের বিভীষিকাময় রাতে হারিয়ে যাওয়া উত্তম বড়ুয়ার ১৩ বছর পর ফ্রান্সে দেখা মেলার খবরে রামুর মানুষের মনে পুরোনো স্মৃতি নতুন করে নাড়া দিয়েছে—তবে তার ফিরে আসা নয়, বিচারহীনতার বেদনা আজও রয়ে গেছে।
মন্তব্য করুন