

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


শিশুদের হাতে বই-খাতা, সামনে শিক্ষক। কিন্তু নেই কোনো বিদ্যালয় ভবন, নেই নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ। একটি রাস্তার ওপর খুঁটি পুঁতে টিনের চালা দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ঘরেই চলছে ক্লাস। বৃষ্টি নামলেই টিনের ফাঁক গলে পানি পড়ে বই-খাতার ওপর, আবার প্রচণ্ড রোদে ঘেমে ওঠে পুরো শ্রেণিকক্ষ। ক্লাস চলার সময় পাশ দিয়ে ছুটে যায় মোটরসাইকেল, ভ্যান, গবাদিপশু ও পথচারী। এমন প্রতিকূল পরিবেশেই লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ১০৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭৪ জন শিক্ষার্থী।
১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি একসময় যমুনা তীরবর্তী চকরতিনাথ গ্রামের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল। এখান থেকে পড়াশোনা করে অনেক শিক্ষার্থী দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু যমুনার ভয়াল ভাঙন বারবার কেড়ে নিয়েছে বিদ্যালয়টির অস্তিত্ব। ২০১৫ সাল থেকে শুরু হওয়া নদীভাঙনে এ পর্যন্ত ছয়বার বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৭ মে বিদ্যালয়ের ভবনও যমুনার গর্ভে চলে যায়।
ভবন হারিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে শিক্ষকরা নিজেদের উদ্যোগে চাঁদা তুলে হাটশেরপুর গ্রামের একটি রাস্তার ওপর একচালা টিনের অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করেন। গত ৮ জুন থেকে সেখানেই চলছে পাঠদান।
তবে অস্থায়ী এই শ্রেণিকক্ষে নেই কোনো বেঞ্চের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, নেই বিদ্যুৎ কিংবা বাথরুম। চারদিক খোলা থাকায় বৃষ্টি হলে শিক্ষার্থীরা ভিজে যায়, আবার প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করতে হয়। এর সঙ্গে রাস্তা দিয়ে যানবাহন, পথচারী ও গবাদিপশুর চলাচলের কারণে পাঠদানে সৃষ্টি হচ্ছে বারবার বিঘ্ন। ফলে সামনে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা থাকলেও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিখন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
একসময় বিদ্যালয়টিতে ৪৮২ জন শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর নদীভাঙনে আশপাশের গ্রামগুলোর অসংখ্য পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৭৪ জনে। বিদ্যালয়ে অনুমোদিত ছয়জন শিক্ষক থাকলেও দুজন প্রশিক্ষণে থাকায় বর্তমানে চারজন শিক্ষক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, কয়েকটি নদী পার হয়ে তাকে স্কুলে আসতে হয়। কিন্তু স্কুলে এসেও কখনো বৃষ্টিতে ভিজতে হয়, আবার কখনো প্রচণ্ড রোদের মধ্যে ক্লাস করতে হয়। রাস্তা দিয়ে মানুষ ও যানবাহন চলাচল করায় পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত একটি স্থায়ী ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে বিদ্যালয়টি স্থানান্তরের দাবি জানায় সে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জিন্নাহ আলম বলেন, "গত ১০ বছরে ছয়বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছি। সর্বশেষ ভবন নদীতে বিলীন হওয়ার পর উপায় না পেয়ে নিজেদের অর্থ সংগ্রহ করে রাস্তার ওপর অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করেছি। এখানে বাথরুম নেই, বিদ্যুৎ নেই, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক—সবারই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একটি স্থায়ী জায়গায় বিদ্যালয়টি স্থানান্তরের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি।"
সারিয়াকান্দি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মাহাতাবুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়টি একাধিকবার পরিদর্শন করা হয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বিদ্যালয়টি নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে পাঠদানের ব্যবস্থা করতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও শিক্ষকরা বলছেন, যমুনার ভাঙন শুধু একটি বিদ্যালয়ের ভবন ধ্বংস করছে না, ধীরে ধীরে একটি প্রজন্মের শিক্ষার ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই দ্রুত বিদ্যালয়টি নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করে স্থায়ী ভবন নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।