শুক্রবার
১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন দখলে দলমত নেই, এক কাতারে বিএনপি-জামায়াত-আ.লীগ

শাহীন মাহমুদ রাসেল
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ০৪:৩৫ পিএম
এনপিবি কোলাজ
expand
এনপিবি কোলাজ

একসময় যেখানে জোয়ার-ভাটার ছন্দে মাথা দুলাতো কেওড়া, বাইন আর অন্যান্য ম্যানগ্রোভ গাছ, সেখানে এখন চোখজুড়ে শুধু মাটির বাঁধ, লবণ মাঠ আর চিংড়ি ঘের। উপকূলকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করা কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপের প্রায় ১০ হাজার একর প্যারাবন যেন নীরবে গিলে খেয়েছে একটি প্রভাবশালী দখলদার চক্র।

মহেশখালী উপজেলার পশ্চিমে অবস্থিত সোনাদিয়া দ্বীপ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশগত অঞ্চল। লাল কাঁকড়া, সামুদ্রিক কাছিম ও বিরল প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল হওয়ায় সরকার বহু আগেই দ্বীপটিকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) ঘোষণা করে। আইন অনুযায়ী এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ, ভূমির গঠন কিংবা জীববৈচিত্র্যের ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা বাণিজ্যিক রূপান্তর নিষিদ্ধ। তবে বাস্তব চিত্র বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প।

ইকোট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাত্র ১ হাজার ১ টাকার বিনিময়ে সোনাদিয়ার ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর বনভূমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

২০১৭ সালের মে মাসে উপকূলীয় বন বিভাগের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জমি বুঝে নেয় বেজা। তবে প্রায় এক দশক পার হলেও সেখানে দৃশ্যমান কোনো ইকোট্যুরিজম প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। বরং প্রকল্পের আড়ালে উধাও হয়ে গেছে হাজার হাজার একর প্যারাবন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গা ঘাট থেকে সোনাদিয়ার দিকে যাওয়ার পথে খালের দুই পাশে দীর্ঘ মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে কোনো নতুন সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু বাঁধের ভেতরে প্রবেশ করলেই সামনে আসে অন্য বাস্তবতা। যেখানে একসময় ছিল ঘন প্যারাবন, সেখানে এখন সারি সারি মাছের ঘের। কাটা পড়ে আছে অসংখ্য কেওড়া ও বাইন গাছের শুকনো শেকড়, ডালপালা ও গুঁড়ি। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ম্যানগ্রোভ বনভূমির অস্তিত্ব এখন কেবল স্মৃতি।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ঘটিভাঙ্গা থেকে সোনাদিয়া পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার একর এলাকায় প্যারাবন ধ্বংস করে তৈরি করা হয়েছে লবণ মাঠ ও চিংড়ি ঘের। শুষ্ক মৌসুমে এসব জমিতে লবণ উৎপাদন করা হয়, আর বর্ষা মৌসুমে তা পরিণত হয় চিংড়ি খামারে।

সরেজমিনে অন্তত শতাধিক বড় ঘেরের অস্তিত্ব দেখা গেছে। বিভিন্ন স্থানে এখনো কেওড়া ও বাইন গাছ কেটে বনভূমি পরিষ্কার করার কাজ চলছে। কোথাও কোথাও বনভূমি দ্রুত দখলের উদ্দেশ্যে গাছে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)-এর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, প্যারাবন শুধু গাছের সমষ্টি নয়, এটি উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের আঘাত থেকে উপকূলীয় জনপদকে রক্ষা করে এই বন। কেওড়া ও বাইন গাছ উপকূলীয় মাটি ধরে রাখে। এগুলো কেটে ফেললে ভূমিক্ষয় বাড়ে, খাল-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং মাছ, কাঁকড়া, পাখিসহ অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বনভূমি দখল ও চিংড়ি ঘের তৈরির সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন হলেও প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলের লোকজন জড়িত।

এ বিষয়ে এক ধরনের অলিখিত সমঝোতা থাকায় সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। বন বিভাগের দায়ের করা মামলার এজাহারেও উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

মামলার ৮ নম্বর আসামি জামায়াত নেতা ছৈয়দুল হক সিকদার, যিনি মামলার ৭ নম্বর আসামি ও মহেশখালী উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল করিমের ভগ্নিপতি।

স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল করিম জয়েরও দুটি ঘের রয়েছে এলাকায়। তিনি সাজেদুল করিমের ছোট ভাই। যদিও মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে আজিজুল করিম জয় এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। এছাড়া তাদের চাচাতো ভাই আওয়ামী লীগ কর্মী জাহাঙ্গীর, রহমতুল্লাহসহ পরিবারের আরও কয়েকজনের নামে একাধিক ঘের রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

মামলার ৬ নম্বর আসামি মো. শমসের সাবেক সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিকের ফুফাতো ভাই। মামলার ১১ নম্বর আসামি কাইছার সিকদার বর্তমান উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুবক্কর ছিদ্দিক ও সাবেক মেয়র মকছুদ মিয়ার ছোট ভাই।

মামলার ৫ ও ৯ নম্বর আসামি মোস্তফা আনোয়ার ও মহসিন আনোয়ার সাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মরহুম আনোয়ার পাশা চৌধুরীর ছেলে। আর ১৩ নম্বর আসামি শাহেদ সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিনের ছোট ভাই।

এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও প্যারাবন কেটে লবণ মাঠ তৈরির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামাল, ইউপি সদস্য ছিদ্দিক রিমন, জয়নাল মেম্বার, একরাম মেম্বারসহ আরও অনেকে।

পরিবেশকর্মী রুহুল আমিনের অভিযোগ, প্যারাবন ধ্বংসের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত।

তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তারা কেবল দৃশ্যমান অংশ। আরও অনেক বড় রাঘববোয়াল এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। অভিযুক্তদের অনেকেই ইতোমধ্যে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

গত ৪ জুন কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাঙ্গা এলাকার প্যারাবনে আগুন লাগে। টানা কয়েকদিন ধরে আগুন জ্বলতে দেখা যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্রুত বন পরিষ্কার করে দখল নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগানো হয়েছে। এছাড়া দখলদাররা সশস্ত্র পাহারা বসিয়ে বনভূমিতে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃতি নিজেই উপকূলকে রক্ষার জন্য যে সবুজ প্রাচীর গড়ে তুলেছিল, তা আজ কেটে ফেলা হচ্ছে লবণ মাঠ ও চিংড়ি ঘেরের জন্য। প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা, রাজনৈতিক প্রভাব ও দখলদারদের দৌরাত্ম্যে সোনাদিয়ার প্যারাবন এখন অস্তিত্ব সংকটে। যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে শুধু কয়েক হাজার একর বনভূমিই নয়, ঝুঁকির মুখে পড়বে পুরো উপকূলীয় পরিবেশব্যবস্থা। আর একদিন হয়তো সোনাদিয়ার প্যারাবনের গল্প কেবল ইতিহাসের পাতাতেই খুঁজে পাওয়া যাবে।

মহেশখালী গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন, অধিকাংশ প্যারাবন বেজার নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থাতেই কাটা হয়েছে।

তিনি জানান, বন বিভাগের জন্য প্রায় ৫ হাজার একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। ঘের উচ্ছেদের বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেই। তবে বাঁধ নির্মাণের কারণে ব্যাপক পলি জমেছে। স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ ফিরিয়ে আনা না গেলে বনায়ন করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, আগেও অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। নতুন করে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, সোনাদিয়ার প্যারাবন নিধনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫৩ জন দখলদারের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত আদালতে জমা দেওয়া হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
USA VS Australia
Scheduled
20 Jun, 01:00 AM
VS
World Cup