


বালুকাবেলায় ভাসে অগণিত পলিথিন আর প্লাস্টিক বোতল। পর্যটনের ভিড়ে প্রতিদিন পাহাড়, সৈকত, বাজার আর রাস্তায় জমে ওঠে টন টন প্লাস্টিক বর্জ্য। একসময় এই বর্জ্যই ছিল কক্সবাজারের পরিবেশের সবচেয়ে বড় হুমকি।
কিন্তু এখন সেই নোংরাই বদলে যাচ্ছে নতুন সম্ভাবনায়- পরিবেশবান্ধব পণ্যে, কর্মসংস্থানে, আর একটুখানি আশায়।
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্যকে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে কক্সবাজারে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে আধুনিক প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কারখানা। রামু উপজেলার মিঠাছড়িতে স্থাপিত এই কারখানাটি বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) উদ্বোধন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা বলেন, এটি কক্সবাজারে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এক নতুন অধ্যায়- একটি ‘মাইলফলক’।
কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর, প্রতি বছর লাখো পর্যটকের পদচারণায় মুখর। কিন্তু সেই ভিড়েরই ছায়া হয়ে প্রতিদিন জমছে পাহাড়সম বর্জ্য।
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই শহরে দিনে প্রায় সাড়ে ৩৪ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। পর্যটকদের অবহেলা, বাজারের অতিরিক্ত মোড়ক ব্যবহার এবং বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন- সব মিলিয়ে এই পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। এর বেশির ভাগই পলিথিন, পণ্যের মোড়ক, পলিপ্রোপিলিন বা পাতলা প্লাস্টিক- যেগুলো পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা কঠিন, এমনকি বাজারমূল্যও নেই। ফলে বছরের পর বছর এসব বর্জ্য জমে থাকছে খাল-বিল, সৈকত ও ড্রেনে, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশছে সমুদ্রে।
কিন্তু এখন সেই বর্জ্যই নতুন রূপ নিচ্ছে। রিসাইক্লিং কারখানার উৎপাদন লাইনে প্রবেশের পরই সেসব অচল পলিথিন থেকে তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব সোফা, বেঞ্চ, খুঁটি, এমনকি টেকসই নির্মাণ উপকরণ- যেগুলো একদিকে দৃষ্টিনন্দন, অন্যদিকে টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ বলেন, ‘এই প্রকল্প শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নয়, এটি পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশ প্লাস্টিক দূষণমুক্ত ভবিষ্যতের পথে অনেকটাই এগিয়ে যাবে।’
তার মতে, এ ধরনের স্থানীয় উদ্যোগ শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বাড়বে, পাশাপাশি সচেতনতা তৈরি হবে ঘরে ঘরে- যে প্লাস্টিক মানেই এখন আর দূষণ নয়, বরং সম্পদের এক নতুন সম্ভাবনা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বুশরা নিশাত, ইউএনওপিএস বাংলাদেশের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজর মেইসন সালাম, পৌর প্রশাসক নিজাম উদ্দিন আহমেদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ইবনে মায়াজ প্রামাণিক, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন, এবং ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী।
ইউএনওপিএসের মেইসন সালাম বলেন, ‘এটি এমন একটি উদ্যোগ, যেখানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোকে সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া হচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ইউএনওপিএস দীর্ঘমেয়াদে কাজ করে যাবে।’
ড. মো. লিয়াকত আলী জানান, ‘প্লাস্টিক ফ্রি রিভারস অ্যান্ড সিজ ফর সাউথ এশিয়া (PLEASE)’ প্রকল্পের আওতায় ব্র্যাক দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারকে প্লাস্টিক দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই কক্সবাজার পৌরসভার সহযোগিতায় কারখানাটি স্থাপন করা হয়েছে।
তার ভাষায়- এখানে শুধু বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে না, বরং গড়ে উঠছে এক নতুন সামাজিক অর্থনীতি- যেখানে প্লাস্টিক সংগ্রাহক, বিক্রেতা, শ্রমিক, উৎপাদক ও বিক্রেতা- সবাই একটি চক্রের অংশ। এটি নারী ক্ষমতায়ন, আয় বৃদ্ধি ও পরিবেশ সংরক্ষণ- তিন দিকেই কাজ করছে।
মিঠাছড়ির এই রিসাইক্লিং কারখানাটি ৫ হাজার ২৮০ বর্গফুট আয়তনের, যেখানে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কেজি পর্যন্ত প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব। পরিবেশের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে কারখানাটিতে রয়েছে আধুনিক Effluent Treatment Plant (ইটিপি), যার দৈনিক ধারণক্ষমতা ২ হাজার লিটার।
এছাড়া এখানে রয়েছে সোলার পাওয়ার সিস্টেম, ফায়ার সেফটি ইউনিট, ইলেকট্রিক সাবস্টেশন এবং ২৪ ঘণ্টা কার্যকর সিসিটিভি নজরদারি ব্যবস্থা।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ইবনে মায়াজ প্রামাণিক বলেন, ‘এই রিসাইক্লিং কারখানার পাশাপাশি কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নতুন স্থাপনা নির্মাণ চলছে। ভবিষ্যতে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগও নেওয়া হবে।’
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে এই মডেলটি জেলার অন্যান্য পৌরসভায়ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে সমগ্র কক্সবাজার জেলাকে ধীরে ধীরে একটি ‘প্লাস্টিক ফ্রি জোন’ হিসেবে গড়ে তোলা যায়।
এই প্রকল্পটি দক্ষিণ এশিয়া কোঅপারেটিভ এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম (SACEP)-এর তত্ত্বাবধানে, বিশ্বব্যাংক ও ইউএনওপিএস-এর আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। স্থানীয় অংশীদার হিসেবে কাজ করছে ব্র্যাক, সহযোগিতায় কক্সবাজার পৌরসভা।
প্রকল্পটির লক্ষ্য শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ায় প্লাস্টিক দূষণের আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় একটি কার্যকর মডেল গড়ে তোলা।
বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বুশরা নিশাত বলেন, ‘প্লাস্টিক এখন বৈশ্বিক সংকট। কিন্তু কক্সবাজারের মতো শহরে স্থানীয় উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা দেখিয়ে দিয়েছে- সমাধানও স্থানীয়ভাবেই সম্ভব।’
কারখানার অন্যতম লক্ষ্য হলো নারী বর্জ্য সংগ্রাহকদের ক্ষমতায়ন। ব্র্যাক জানায়, এখানে কর্মরত কর্মীদের একটি বড় অংশ নারী। তারা আগে যত্রতত্র প্লাস্টিক কুড়িয়ে বিক্রি করতেন সামান্য মূল্যে। এখন তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে এই কারখানার নিয়মিত কর্মী, পাচ্ছেন স্থায়ী আয় ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ।
রিসাইক্লিং কারখানার এক নারী কর্মী জানালেন, ‘আগে আমরা বর্জ্য সংগ্রহ করে দিনে ২০০-২৫০ টাকা পেতাম। এখন একই কাজে পাচ্ছি তিনগুণ আয়, নিয়মিত বেতন আর সম্মান।’
কক্সবাজারের নদী, খাল ও সৈকতে যেভাবে প্লাস্টিকের স্তূপ জমে উঠেছিল, এই কারখানাটি সেই সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা দিচ্ছে। প্রতিদিন প্রক্রিয়াজাত বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে, আর ধীরে ধীরে শহরটি ফিরে পাচ্ছে তার হারানো শ্বাস।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই প্রকল্প কেবল একটি কারখানা নয়- এটি একটি আন্দোলন, যার লক্ষ্য ‘বর্জ্য থেকে সম্ভাবনা, দূষণ থেকে দায়িত্ব’ -এর পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া।
তাদের মতে, একসময় সৈকতের ধারে ছড়িয়ে থাকা পলিথিন ছিল উপহাসের প্রতীক, আজ সেটিই সম্ভাবনার গল্প বলছে। নোংরা থেকে নন্দনে, বর্জ্য থেকে সম্পদে- কক্সবাজারের এই রিসাইক্লিং কারখানা যেন এক নতুন বার্তা দিচ্ছে আমাদের সকলকে ফেলনা কিছু নেই- যদি আমরা বদলাতে পারি দৃষ্টিভঙ্গি।
মন্তব্য করুন