


জামালপুর জেলা ছাত্রদলের নবঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘিরে জেলায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এই কমিটিতে প্রবাসী, মাদক মামলার এজাহারভুক্ত আসামি, বিবাহিত ও অছাত্রদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগঘেঁষা ব্যক্তিরাও স্থান পেয়েছেন।
এছাড়া নির্দিষ্ট একটি অঞ্চল, বিএনপি নেতাদের স্বজন এবং ৫ আগস্টের পর যুক্ত হওয়া কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে।
গত ১ মে জামালপুর জেলা ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এতে স্বাক্ষর করে অনুমোদন দেন। নতুন ও পুরাতনদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটিতে স্থান পেয়েছেন মোট ৪৫৩ জন। জেলা ছাত্রদলের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় কমিটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ এই বৃহৎ কমিটিতে রয়েছে-১ জন সিনিয়র সহ-সভাপতি, ১ জন সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ১ জন সাংগঠনিক সম্পাদক, ৩৩ জন সহ-সভাপতি, শতাধিক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ৮৬ জন সহ-সাধারণ সম্পাদক, অর্ধশতাধিক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, ৩১ জন বিভিন্ন বিষয়ক সম্পাদক, ৩১ জন সহ-সম্পাদক, ২০ জন সদস্য (সহ-সভাপতি পদমর্যাদা), ২১ জন সদস্য (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদমর্যাদা) এবং ৩৮ জন সদস্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- কমিটিতে জায়গা পাওয়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিলয় আহমেদ নয়ন মাদক মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। জামালপুর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে (এফআইআর নং-১৪/৫৭২ ও জিআর নং-৫৭২/২০২২) এবং তিনি একবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।
এছাড়াও কমিটিতে অর্ধশতাধিক বিবাহিত ব্যক্তি রয়েছেন। এর মধ্যে সহ-সভাপতি পদ পাওয়া মিথুন খান অন্যতম। তার কন্যা সন্তানের বয়স কমপক্ষে ১০ বছর।
কমিটি পর্যালোচনায় তিনজন প্রবাসী ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে, যারা দেশের বাইরে অবস্থান করেও পদ পেয়েছেন। এর মধ্যে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা রয়েছেন রাশিয়ায়। সহ-সাধারণ সম্পাদক রাকিব হাসান আছেন মালয়েশিয়াতে। এছাড়া সম্প্রতি শরিফপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক অমিত হাসান রবিনকে বহিষ্কারের পর সেই আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া সত্ত্বেও তিনি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পেয়েছেন এবং বর্তমানে রয়েছেন দেশের বাইরে।
কমিটিতে একাধিক পদধারী ব্যক্তিও রয়েছেন। যেমন-জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক বুলবুল আহমেদ একই সঙ্গে ৯ নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এবং জামালপুর শহর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে- নবগঠিত কমিটির সহ-সভাপতি মাজহারুল ইসলাম, সহ-সাধারণ সম্পাদক হাসেম রেজা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ঘেঁষা। তাদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে তোলা ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোরাঘুরি করছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যোগ দেওয়া বেশ কয়েকজন সদস্য পদ পেয়েছেন। মো. মুস্তাকিম হয়েছেন সদস্য (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদমর্যাদা) এবং অনিক হয়েছেন সদস্য (সহ-সভাপতি পদমর্যাদা)।
এসব কারণে ইতিমধ্যে নবগঠিত কমিটি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া মো: সাইদুল মুরসালিন সাদ্দাম। জ্যেষ্ঠতা ও দীর্ঘদিনের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন- “৫ আগস্টের পরে উড়ে এসে জুড়ে বসা লোকদের প্রাধান্য দিয়ে কমিটি করা হয়েছে। অনেকের ছাত্রত্ব নেই, অনেকে বিবাহিত। সিনিয়র-জুনিয়র বিবেচনা করা হয়নি। এমন কমিটিতে আমি থাকতে চাই না। আমি দলকে ভালোবাসি বলেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া নাজমুস সাকিব তন্ময় বলেন- “এই কমিটিতে এত বেশি লোককে পদ দেওয়া হয়েছে যে সব মিলিয়ে জগা খিচুড়ি হয়ে গেছে। অছাত্রত্বে ভরপুর। কোনো প্রটোকল মানা হয়নি। শতাধিক বিবাহিত, অর্ধশতাধিক অছাত্র। এমনকি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ঘেঁষা ব্যক্তিদেরও পদ দেওয়া হয়েছে। এই কমিটিতে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। আমিও পদত্যাগ করব।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ছাত্রনেতা বলেন- “আমি যে এই কমিটিতে একটি পদ পেয়েছি, তা প্রকাশ করতেও লজ্জা লাগে। এমন কেউ নেই, যে পদ পায়নি। অনেকেই আগে কোনো পদে ছিল না, সরাসরি জেলা পর্যায়ের পদ পেয়েছে। এমনকি প্রবাসীদেরও পদ দেওয়া হয়েছে। কীসের বিনিময়ে এমন হয়েছে, তা আমরা বুঝতে পারছি না। এছাড়া রশিদপুর, হাটচন্দ্রা ও বাগেরহাটা বটতলা এলাকার নেতাকর্মীদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।”
এসব বিষয়ে জামালপুর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান সুমিল বলেন- “দীর্ঘদিন পর জেলায় জেলা ছাত্রদলের একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছে। আমি ত্যাগী নেতাকর্মীদের নিয়েই কমিটি করতে চেয়েছিলাম। তবে জেলার অভিভাবক ও ঢাকাস্থ নেতাদের মতামত রাখতে হয়েছে। বিভিন্ন কারণে কমিটি বড় করতে হয়েছে। এই কমিটি নিয়ে কারো কোনো ক্ষোভ নেই।”
তিনি আরও বলেন- “এই কমিটিতে ছাত্রলীগের কোনো পদধারী নেই। কমিটি ভালো হয়েছে। একজন প্রবাসী রয়েছেন, তবে তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন বলে তাকে পদ দেওয়া হয়েছে।”
আর জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো: শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন- “কেউ যদি ত্যাগী হয় এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকে, তাহলে বিবাহিত হলেও সমস্যা নেই। আর কমিটিতে অছাত্র থাকার বিষয়টি সঠিক নয়। সিনিয়র-জুনিয়র মিলিয়েই কমিটি করা হয়েছে।”