

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


যশোর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে রাতের বেলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সচরাচর উপস্থিত থাকেন না। এতে করে জরুরি চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের অনুপস্থিতিতে কাটা-ছেঁড়াসহ জটিল রোগীর সেবা দিচ্ছেন ওয়ার্ডবয়, আয়া কিংবা ঝাড়ুদারেরা। তারা রোগীর স্বজনদের কাছে চিকিৎসা সামগ্রী কেনার তালিকা ধরিয়ে দিয়ে নিজেরাই ইনজেকশন, স্যালাইন, সিরিঞ্জ, সেলাই বা ইউরিন ব্যাগ লাগানোর কাজ করে থাকেন।
এই হাসপাতালে যশোর ছাড়াও নড়াইল, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার রোগীরা উন্নত চিকিৎসার আশায় আসেন। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তারা নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা দিনে একবার সকালে তড়িঘড়ি করে ওয়ার্ড পরিদর্শনে আসেন। ফলে রোগীরা তাদের অসুস্থতা নিয়ে যথাযথভাবে আলোচনা করতে পারেন না। এতে অনেকে শেষ পর্যন্ত বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হন। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী টানতেই সরকারি হাসপাতালে ডাক্তাররা দায়িত্ব এড়িয়ে যান।
রোগীর স্বজন রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন সকালে বিশেষজ্ঞরা দল বেঁধে রাউন্ডে আসেন। কিন্তু তারা খুব অল্প সময় রোগীর সঙ্গে কথা বলে চলে যান। সারাদিন কিংবা রাতে আর দেখা মেলে না।” একই অভিজ্ঞতার কথা জানান আরও কয়েকজন স্বজন।
পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে কয়েকদিন ধরে অবস্থান করে দেখা গেছে, দুর্ঘটনায় আহত বা ছুরিকাহত বহু রোগী ভর্তি হলেও চিকিৎসা দিচ্ছেন মূলত ইন্টার্নরা। সহকারী রেজিস্ট্রার বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা খুব কমই আসেন। রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে ইন্টার্নরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্যত্র রেফার করে দিচ্ছেন। গত এক সপ্তাহে অন্তত ২২ জন রোগীকে খুলনা বা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ছুরিকাহত সাকিব (১৯) নামের এক যুবককে ঢাকায় রেফার করা হয়।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রোগী ভর্তি হলে প্রথমে ইন্টার্ন ডাক্তার প্রাথমিক অবস্থা দেখবেন, এরপর সহকারী রেজিস্ট্রারকে অবহিত করবেন। রোগীর অবস্থা খারাপ মনে হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞকে ডাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়া মানা হয় না। এক সিনিয়র নার্সের ভাষ্য, “প্রায় সব দায়িত্বই ইন্টার্নদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
তদন্তে জানা গেছে, এই অনিয়মের আড়ালে রয়েছে ব্যক্তিগত বাণিজ্যের সুযোগ। বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চেম্বার চালাতে ব্যস্ত থাকেন। ইন্টার্নরা মোবাইল ফোনে রোগীর অবস্থা জানালে অনেক সময় বিশেষজ্ঞরা ফোনেই চিকিৎসার নির্দেশ দিয়ে দেন। এমনকি হাসপাতালের রোগীর ফাইলেও ইন্টার্নদের হাতে লেখা চিকিৎসা পরামর্শের নজির রয়েছে। বিনিময়ে ইন্টার্নরা দৈনিক ভিত্তিতে সম্মানি পেয়ে থাকেন।
রাতের বেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সহকারী রেজিস্ট্রার না থাকায় ওয়ার্ডবয়, আয়া ও ঝাড়ুদাররা নিজেরাই ক্ষত সেলাই, ক্যানোলা লাগানোসহ নানা চিকিৎসা কার্যক্রম চালান। রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে সরঞ্জাম কেনার অজুহাতে অর্থও আদায় করেন। সার্জারি, মেডিসিন ও গাইনী ওয়ার্ডের প্রায় সর্বত্র এ চিত্র দেখা যায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহের মহেশপুরের রোগী তাহমিনা খাতুন (৪৫) সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। রাতে চিকিৎসক না পেয়ে দায়িত্বরত আয়া নিজেই তার ক্ষত সেলাই করে দেন।
এছাড়া রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, দিনের বেলায়ও জরুরি বিভাগ ছাড়া অন্য ওয়ার্ডে ডাক্তার মেলে না। সিনিয়র সেবিকারা অনেক সময় একাধিকবার ডাকার পরও আসেন না এবং রুক্ষ আচরণ করেন। ফলে শিক্ষানবীশ সেবিকাদের দিয়েই অধিকাংশ কাজ সারতে হয়।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মীদের নিয়মিত দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়েছেন। তারপরও কেউ যদি রাতের শিফটে ওয়ার্ড রাউন্ডে না যান, তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন
