শুক্রবার
০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কাজ নেই ‘মানুষ বিক্রির হাটে’, অর্ধাহারে দিন কাটছে শ্রমজীবীদের

খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম
কাজের জন্য অপেক্ষা করছেন দিনমজুররা
expand
কাজের জন্য অপেক্ষা করছেন দিনমজুররা

ঘন কুয়াশার চাদরে মোড়ানো পৌষের কাকডাকা ভোর। উত্তরের হিমেল বাতাসে কাঁপছে অস্থিমজ্জা। নগরীতে তখনও দিনের আলো ফোটেনি। অথচ এই শীতল ভোরেই খুলনার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসেছে মানুষের শ্রম বিক্রির হাট। এখানে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয় মানুষের ঘামঝরা শ্রম। কিন্তু তীব্র শৈত্যপ্রবাহে সেই হাট আজ প্রায় নিষ্প্রাণ। কাজ নেই, নেই ডাক।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত খুলনা নগরের শিববাড়ী চত্বর, ময়লাপোতা মোড় ও সাত রাস্তার মোড়ে সরেজমিনে দেখা গেছে এমন করুণ চিত্র। শীত থেকে বাঁচতে কেউ মলিন সোয়েটার, কেউ ছেঁড়া লুঙ্গি, পুরোনো প্যান্ট, মাথায় টুপি আর পায়ে মোজা পরে রাস্তার ধারে বসে আছেন। হাতে কোদাল, ঝাড়ু কিংবা কাজের ব্যাগ। কিন্তু ডাক আসছে না কোথাও থেকে।

দিনমজুররা জানান, সাধারণত নির্মাণকাজ ও গৃহস্থালির কাজের জন্য প্রতিদিন জনপ্রতি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরিতে মহাজনরা তাদের নিয়ে যান। খুলনা নগরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার স্বল্প আয়ের মানুষরা প্রতিদিন ভোরে এসব মোড়ে জড়ো হন কাজের আশায়। তবে শৈত্যপ্রবাহ শুরু হওয়ার পর থেকেই নির্মাণসহ নানা খাতে কাজ কমে গেছে। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অসংখ্য দিনমজুর।

ময়লাপোতা মোড়ে বসে থাকা বয়স্ক রাজমিস্ত্রি মোবারেক মোড়ল বলেন, ফজরের পর থাইকা আইসা দাঁড়াই থাকি। যাগে বাড়ি কাম-কাজ চলে, তারা এখান থাইকা লোক নেয়। কিন্তু এই শীতে কামকাজ খুব কমে গেছে।

নারী শ্রমিক রিজিয়া পারভীন বলেন, পুরুষদের তুলনায় এমনিতেই আমাদের কাজ কম। শীতে আরও কমে গেছে। সংসার চালাতে গিয়ে দেনার বোঝা বাড়তেছে।

শিববাড়ী মোড়ে দিনমজুর খোকন সরদার ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে বলেন, গত দুই দিন কাম পাইনি। ভোর ছয়টায় আইসি, দশটার সময় বাড়ি ফিরি। আজও যদি কাম না পাই, ধার কইরা বাজার করতি হবে। আমরা গরীবরা না খাইয়া মইরা যাচ্ছি।

শুধু কাজের অভাব নয়, আয় বন্ধ থাকায় এসব শ্রমজীবী মানুষের পরিবারগুলোও পড়েছে চরম খাদ্যসংকটে। অনেকেই অর্ধাহারে-অনাহারে দিন পার করছেন বলে জানান।

এদিকে খুলনা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, শীতের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। খুলনা আবহাওয়া অফিস বলছে, খুলনা বিভাগে তাপমাত্রা ১১ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। আকাশ মেঘলা থাকায় তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকলেও শীতের অনুভূতি তীব্র। আরও দুই-তিন দিন ঘন কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সঙ্গে শীতের প্রকোপও বাড়বে।

এ পরিস্থিতিতে কর্মহীন শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিশেষ উদ্যোগের দাবি উঠেছে। খুলনা ফুড ব্যাংকের পরিচালক শাফায়েত সরদার বলেন, অনেক উন্নত দেশে কর্মহীন মানুষের জন্য ভর্তুকি বা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের দেশে সেই সুযোগ খুবই সীমিত। আমরা আশা করবো, সরকার শীতকালে কর্মহীন নিম্নআয়ের মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেবে।

শীত যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে খুলনার শ্রমজীবী মানুষের অসহায়ত্ব। মানুষের শ্রম বিক্রির হাটে বসে থাকা এসব মানুষ এখন শুধু কাজ নয়, চাইছে বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X