

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


নেত্রকোনায় অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) করে দেওয়ার ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে—নেত্রকোনা সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসের একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মবহির্ভূতভাবে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে। এর মাধ্যমে তারা পাচ্ছে বাংলাদেশি নাগরিকত্বের পরিচয়, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দাড়াচ্ছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জান্নাত বেগম নামের এক নারীর নামে তৈরি করা হয়েছে একটি জাতীয় পরিচয়পত্র। ওই এনআইডির নম্বর ৩৩৩১০৮৯৫৮৫। পরিচয়পত্রে পিতার নাম দেখানো হয়েছে মো. আব্দুল হাসিম, মাতার নাম মোসাঃ আনজু এবং ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে নেত্রকোনা সদর উপজেলার পুকুরিয়া গ্রাম। কিন্তু এসব তথ্য যাচাই করতে গিয়ে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর অসংগতি।
অনুসন্ধানে পিতা-মাতার এনআইডি যাচাই করে দেখা যায়, মো. আব্দুল হাসিম ও মোসাঃ আনজু প্রকৃতপক্ষে স্বামী-স্ত্রী এবং তারা নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার বিরামপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। প্রায় ১০ বছর আগে আব্দুল হাসিম মৃত্যুবরণ করেন। তাদের সংসারে চার ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। একমাত্র মেয়ের নাম স্নিগ্ধা আক্তার হাসি। জান্নাত বেগম নামে তাদের কোনো কন্যাসন্তান নেই।
পরিবারের সদস্য মোতাহার হোসেন এ বিষয়ে কথা বললে তিনি জানান, আমার জান্নাত বেগম নামে কোনো বোন নেই। আমার একমাত্র বোন স্নিগ্ধা আক্তার হাসি। আট বছর আগে তার ধর্মপাশা সদরে বিয়ে হয়েছে এবং সে সেখানকার ভোটার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বক্তব্যেও একই তথ্য উঠে আসে।
সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আলী নূর বলেন, আব্দুল হাসিম ও মোসাঃ আনজুর সংসারে জান্নাত বেগম নামে কোনো মেয়ে সন্তান নেই। যদি কেউ তাদের পরিচয় ব্যবহার করে ভোটার হয়ে থাকে, তবে সেটা সরাসরি জালিয়াতি।
অনুসন্ধানে ভোটার ডাটা এন্ট্রির প্রুফ কপিতে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরেও গরমিল পাওয়া যায়। নম্বরটিতে ফোন করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলে জানা যায়, নম্বরটির ব্যবহারকারী আরফান শাকিল। তিনি ময়মনসিংহের আকুয়া এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য চীনে অবস্থান করছেন। তিনি জানান, জান্নাত বেগম নামে তার কোনো পরিচিত নেই।
আরও ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে জন্মনিবন্ধন যাচাইয়ে। জান্নাত বেগমের নামে নির্বাচন অফিসে সংরক্ষিত জন্মনিবন্ধনের কপি নিয়ে নেত্রকোনা পৌরসভায় যোগাযোগ করা হলে কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই জন্মনিবন্ধনটি তাদের সার্ভারে নেই। এটি অন্য একটি জন্মনিবন্ধন স্ক্যান করে ডিজিটালভাবে এডিট করে তৈরি করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য পূরণ করা ফরম-২ পর্যালোচনায়। সেখানে শনাক্তকারী, সুপারভাইজার ও যাচাইকারীর এনআইডি নম্বর দেওয়া হলেও সার্ভারে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিতভাবে ভুয়া তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন অফিসের একাধিক কর্মচারী জানান, জান্নাত বেগম একজন রোহিঙ্গা। দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে ভোটার করা হয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সিহাব উদ্দিন এই এনআইডি করে দিয়েছেন। শুধু তিনি নন, এই চক্রের সঙ্গে জেলার অতিরিক্ত নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকও জড়িত। এমনভাবে ১.৫ থেকে ২ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি এনআইডি করা হয়েছে।
ভোটার ফরম-২-এ সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সিহাব উদ্দিনের স্বাক্ষরও পাওয়া গেছে। স্বাক্ষরের নিচে তারিখ উল্লেখ রয়েছে ২১ মার্চ ২০২৫।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সিহাব উদ্দিন বলেন, ভোটার হালনাগাদের সময় জান্নাত বেগম ভোটার হয়েছেন। এতগুলো এনআইডি আলাদাভাবে যাচাই করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এই পরিচয়পত্র তৈরিতে কোনো লেনদেন হয়নি। তদন্তে বহিরাগত প্রমাণ মিললে বাতিলের জন্য চিঠি দেওয়া হবে।
জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন বলেন, আমরা বিষয়টি তদন্ত করব। যদি তিনি রোহিঙ্গা হয়ে থাকেন, তাহলে যারা সহযোগিতা করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, এর আগেও নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের ভুয়া কাগজপত্র তৈরির ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ ডিসেম্বর মোহনগঞ্জ উপজেলায় ইউএনওর আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ১৩ রোহিঙ্গার জন্মনিবন্ধন তৈরি করার ঘটনায় শাওন নামের এক কম্পিউটার দোকানদারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এছাড়াও জেলার কলমাকান্দা উপজেলার রামনাথপুর পাগলা এলাকায় এক রোহিঙ্গা অর্থের বিনিময়ে কামরুল হাসান নামে জাতীয় পরিচয়পত্র (১৯৮২৪৭৯৭৩৩) এবং বাংলাদেশি পাসপোর্ট (এ ০৯৫০৯৫৮৮) সংগ্রহ করার ঘটনাও ঘটেছে।
মন্তব্য করুন
