


শান্তির বার্তা বহন করে একদল বৌদ্ধ ভিক্ষু মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসির কেন্দ্রে পৌঁছান।
টেক্সাস থেকে ১৫ সপ্তাহ ধরে হেঁটে আসা এই ভিক্ষুদের স্বাগত জানাতে বিপুল সংখ্যক আনন্দিত মানুষ জড়ো হয়।
গেরুয়া ও মেরুন রঙের বসন পরিহিত ভিক্ষুরা তাঁদের সঙ্গে থাকা উদ্ধারকৃত কুকুর আলোকাসহ দক্ষিণ-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে হাঁটার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত আলোচনায় ছিলেন।
তাঁদের সহজ কিন্তু গভীর লক্ষ্য শান্তির পক্ষে আহ্বান একটি ক্লান্ত ও বিভক্ত দেশের মানুষের হৃদয়ে সাড়া ফেলেছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই শহরে।
অক্টোবরের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই পদযাত্রা দেখতে হাজার হাজার মানুষ শীতল ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ভিক্ষুদের নীরব অগ্রযাত্রা প্রত্যক্ষ করেন।
দুপুরে ভিক্ষুরা ওয়াশিংটন ন্যাশনাল ক্যাথেড্রালে থামেন, যেখানে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন আরও শতাধিক বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী।
ক্যাথেড্রালের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দলের ক্যারিশমাটিক ও শান্ত স্বভাবের নেতা ভেনারেবল ভিক্ষু পন্নকারা বলেন, “এটা আমাদের জন্য অভিভূত করার মতো।” বিভিন্ন ধর্মের বহু নেতার পাশে দাঁড়িয়ে যাদের মধ্যে ওয়াশিংটনের এপিসকোপাল বিশপ মারিয়ান বাডেও ছিলেন তিনি শান্তির যৌথ আহ্বানে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হন।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তটি আমি সারাজীবন মনে রাখব। আর আশা করি আপনরাও তাই করবেন।
নীরব শ্রদ্ধায় অভ্যর্থনা
ভিক্ষুরা এক সারিতে শহরের রাস্তায় হাঁটলে মানুষ তাঁদের উৎসাহিত করে। কেউ কেউ আবার নীরবতা বজায় রাখতে অনুরোধ করেন। ভিক্ষুরা মানুষের উচ্ছ্বাসের জবাবে মাথা নেড়ে ও হাসি দিয়ে সাড়া দেন অনেকে ‘সাধু!’ বলে ডাকেন, যা বৌদ্ধধর্মে ‘ভালো হয়েছে’ অর্থে ব্যবহৃত হয়।
ওয়াশিংটনে তাঁদের প্রথম প্রকাশ্য কর্মসূচিতে আমেরিকান ইউনিভার্সিটির বেন্ডার অ্যারেনায় প্রায় ৩,৫০০ মানুষ জড়ো হন। তবে কোনো কোলাহল ছিল না; সম্মান জানাতে দর্শকরা নীরবে ভিক্ষুদের প্রবেশ প্রত্যক্ষ করেন।
পথের ঝুঁকি
এই যাত্রায় ঝুঁকিও ছিল। নভেম্বরে হিউস্টনের বাইরে হাইওয়ের ধারে হাঁটার সময় তাঁদের এসকর্ট যানটি একটি ট্রাকের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে দুই ভিক্ষু আহত হন; ভেনারেবল মহা দম্ম ফোম্মাসানের একটি পা কেটে ফেলতে হয়।
জর্জিয়ার স্নেলভিলের একটি মন্দিরের প্রধান ফোম্মাসান পরে ওয়াশিংটনের কাছে আবার দলে যোগ দেন এবং হুইলচেয়ারে করে অ্যারেনায় প্রবেশ করেন।
পথে পথে সমর্থন
ফোম্মাসানের প্রত্যাবর্তন ৩৩ বছর বয়সী জ্যাকসন ভনের জন্য বিশেষ আবেগের ছিল। ২০২৪ সাল থেকে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ভন এক সপ্তাহ ধরে ভিক্ষুদের সঙ্গে ভ্রমণ করছেন ভার্জিনিয়ার ফ্রেডেরিক্সবার্গে তাঁদের শহর দিয়ে যাওয়ার পর থেকেই।
ভন বলেন, 'বিশ্বে অনেক কিছু ঘটছে। শান্তিপূর্ণভাবে মানুষকে একত্রিত হতে দেখা এবং দৃষ্টান্ত স্থাপন এটা সত্যিই দারুণ। বরফে ঢাকা পথে সহযাত্রীদের সহায়তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা খুঁজে পাওয়ার পথে আমি আছি। এই যাত্রা দেখিয়ে দেয় আমরা কতটা সংযুক্ত।
ভিক্ষুরা দেখেছেন তাঁদের বার্তা আদর্শগত বিভাজন ছাড়িয়ে গেছে। অনলাইনে লক্ষাধিক মানুষ তাঁদের অনুসরণ করেছেন; আলাবামার ওপেলিকার একটি গির্জা থেকে ভার্জিনিয়ার রিচমন্ড সিটি হল বিভিন্ন স্থানে ভিড় জমেছে।
৪২ বছর বয়সী ক্রিস্টিন উইলিয়ামস তাঁর ৮ ও ১০ বছর বয়সী দুই সন্তানকে ক্যাথেড্রালের বাইরে মিছিল দেখতে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, আমি চাই ওরা শুধু ইতিহাস দেখুক না, একত্র হওয়ার শক্তিটাও দেখুক।
মঙ্গলবার ২০ হাজারের বেশি মানুষ লাইভ সম্প্রচার দেখেন জ্যামাইকা, জার্মানি, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডসহ নানা দেশ থেকে। মন্তব্যে মাঝে মাঝে সমালোচক থাকলেও, দর্শকেরা ভিক্ষুদের বার্তাকে অনুসরণ করে সমালোচকদের জন্যও শান্তি কামনা করেন।
আধ্যাত্মিক উপহার
১৯ জন ভিক্ষু ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর টেক্সাসের ফোর্ট ওর্থে হুয়ং দাও বিপাসনা ভাবনা কেন্দ্র থেকে ২,৩০০ মাইল (৩,৭০০ কিলোমিটার) যাত্রা শুরু করেন। বিশ্বের বিভিন্ন থেরবাদ বৌদ্ধ মঠ থেকে আগত ভিক্ষুরা ফোর্ট ওর্থ মন্দিরের সহসভাপতি পন্নকারার নেতৃত্বে এই পদযাত্রায় অংশ নেন।
মন্দিরের মুখপাত্র লং সি ডং বলেন, এই হাঁটা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, কিংবা আইন বা নীতিনির্ভর প্রচারণাও নয়।
তিনি বলেন, এটি একটি আধ্যাত্মিক উপহার দৈনন্দিন কাজ, সচেতন পদক্ষেপ ও উন্মুক্ত হৃদয়ের মাধ্যমে শান্তি বাঁচার আহ্বান। আমরা বিশ্বাস করি, ভেতরে শান্তি গড়ে উঠলে তা সমাজে স্বাভাবিকভাবেই ছড়িয়ে পড়ে।
থেরবাদ বৌদ্ধধর্মে শান্তির পদযাত্রা একটি সম্মানিত ঐতিহ্য। যাত্রার কিছু অংশে ভিক্ষুরা খালি পায়ে বা মোজা পরে হেঁটেছেন মাটির স্পর্শ অনুভব করে বর্তমান মুহূর্তে উপস্থিত থাকতে।
ভিক্ষুরা বিপাসনা ধ্যান অনুশীলন ও শিক্ষা দেন বুদ্ধ প্রদত্ত প্রাচীন ভারতীয় এক পদ্ধতি, যা শ্বাস ও মন–দেহ সংযোগে মনোযোগ দেয়। পথে পথে পন্নকারার বক্তৃতায় মানুষকে ফোন নামিয়ে রেখে নিজের ভেতরে শান্তি খোঁজার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার ভিক্ষুরা ১০৮ দিন হাঁটা সম্পন্ন করেন বৌদ্ধধর্মে এটি পবিত্র সংখ্যা, যা আধ্যাত্মিক পূর্ণতা, মহাজাগতিক শৃঙ্খলা ও অস্তিত্বের সামগ্রিকতাকে নির্দেশ করে।
বুধবার তাঁদের ক্যাপিটল হিল দিয়ে হাঁটার পরিকল্পনা রয়েছে এবং লিংকন মেমোরিয়ালে সমাপনী অনুষ্ঠান হবে।
ফেরার পথ তুলনামূলক সহজ হবে। মেরিল্যান্ডের ক্যাপিটলে উপস্থিতির পর বাসে করে তাঁরা টেক্সাসে ফিরবেন; শনিবার ভোরে ফোর্ট ওর্থের ডাউনটাউনে পৌঁছানোর কথা।
এরপর সেখান থেকে সবাই মিলে আবার হাঁটবেন যাত্রার শুরুস্থল মন্দির পর্যন্ত ৬ মাইল (৯.৬ কিলোমিটার)।
মন্তব্য করুন