বুধবার
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মিনেসোটার সংঘাতে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে

কৌশলী ইমা, নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:২৭ এএম
অভিবাসন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা
expand
অভিবাসন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা

মিনেসোটায় ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন দমন অভিযানের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের অবস্থান এখন টুইন সিটিজ অঞ্চলকে এক রাজনৈতিক বারুদের স্তূপে পরিণত করেছে।

বিক্ষোভকারী ও ফেডারেল এজেন্টদের মধ্যে ক্রমশ উত্তপ্ত ও সহিংস সংঘর্ষ একটি বড় সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে।

স্থানীয় কর্মকর্তারা রাজ্যে বিপুলসংখ্যক অভিবাসন প্রয়োগকারী কর্মকর্তার উপস্থিতিকে 'ফেডারেল আগ্রাসন' হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আদালত ও প্রকাশ্য বক্তব্যে তারা আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন, বিশেষ করে মিনেসোটাবাসীর সঙ্গে ফেডারেল বাহিনীর সংঘর্ষ সহিংস হয়ে ওঠার পর এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী রূপ নেওয়ার পর।

৩৭ বছর বয়সী আইসিইউ নার্স আলেক্স প্রেটির গুলিতে নিহত হওয়া পরিস্থিতিকে চরম উত্তেজনার কিনারায় নিয়ে যায়। এরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাজ্য কর্তৃপক্ষ উভয় পক্ষই কৌশলগতভাবে কিছুটা অবস্থান বদলাতে বাধ্য হয়।

তবে ফেডারেল সরকার যখন ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের মুখোমুখি অবস্থানে যাচ্ছে, তখন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন পরিস্থিতি একটি 'প্রেশার কুকার'-এ পরিণত হচ্ছে, যা গৃহযুদ্ধের দিকেও গড়াতে পারে।

কানাডার কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বেসামরিক–সামরিক সম্পর্ক বিশ্লেষক স্টিভ সাইডম্যান বলেন,এই সংকটগুলো যেন ট্রামের মতো প্রতি পাঁচ মিনিটেই একটা করে আসছে।

একবার, দু’বার, তিনবার হয়তো আমরা বড় সহিংসতা এড়াতে পারি। কিন্তু কোনো এক সময়ে গিয়ে আর পারব না আর তখন কিছু একটা ঘটে যেতে পারে।

‘ফোর্ট সামটার মুহূর্ত’ কি না

প্রশাসনের তথাকথিত ‘অপারেশন মেট্রো সার্জ’-এর আওতায় হাজার হাজার অভিবাসন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা মিনিয়াপোলিস ও সেন্ট পলের রাস্তায় নেমে আসে।

স্থানীয় সোমালি সম্প্রদায়কে ঘিরে একটি বড় কল্যাণ তহবিল জালিয়াতি কেলেঙ্কারির পর এই অভিযান জোরদার হয়।

প্রেটির মৃত্যুর আগে একই মাসে ৩৭ বছর বয়সী মা রেনি গুডকেও গাড়ির ভেতরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, আইসিই কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক সংঘর্ষের পর। এই দুই মৃত্যু ফেডারেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়।

মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে বলেন, তিনি “একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের সামনের সারিতে” আছেন।

বুধবার দ্য আটলান্টিক-এ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে মিনেসোটা গভর্নর টিম ওয়ালজ ১৮৬১ সালের সেই যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা টানেন, যেটি মার্কিন গৃহযুদ্ধের সূচনা করেছিল।

ওয়ালজ প্রশ্ন করেন 'এটা কি একটি ফোর্ট সামটার?'

তিনি আরও বলেন, এটা একটি শারীরিক আক্রমণ। এটি একটি সশস্ত্র বাহিনী, যারা আমার বাসিন্দা, আমার নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে, হত্যা করছে।

টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ কেভিন ওয়েট বলেন,গৃহযুদ্ধ অনিবার্য নয়, আবার এড়ানোর পথও নেই এমনটাও নয়। তবে ১৮৬১ সালে দক্ষিণ ক্যারোলিনার ফোর্ট সামটারে প্রথম গুলি ছোড়ার সময় সবাই বুঝেছিল, এক সীমা পার হয়ে গেছে।

ওয়েট বলেন, এটি ফোর্ট সামটার মুহূর্ত হতে পারে। কিন্তু তখন বিদ্রোহী বাহিনী ফেডারেল সেনাদের ওপর হামলা করেছিল। আর এখন মিনেসোটায় ফেডারেল এজেন্টরা বেসামরিক প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলি চালাচ্ছে।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে স্থানীয় ও রাজ্য সরকারের সঙ্গে ফেডারেল সরকারের সংঘাত নতুন কিছু নয়।

'গৃহযুদ্ধের মূলেও ছিল এই দ্বন্দ্ব তখন দাসপ্রথা নিয়ে, আর আজ মিনেসোটায় আবার সেই প্রশ্নই ফিরে এসেছে।”

রাজ্য-ফেডারেল ক্ষমতা নিয়ে আইনি লড়াই

অভিবাসন ও অপরাধ দমন ইস্যুতে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন রাজ্য ও শহরগুলোর বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া অবস্থানের ফলে রাজ্য ও ফেডারেল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়েছে।

মিনেসোটা রাজ্য ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আইসিইকে রাজ্য থেকে সরাতে মামলা করেছে। আদালত এখন ভাবছে এই অভিযান স্থগিত করা হবে কি না।

মেয়র ফ্রে জানিয়েছেন, মিনিয়াপোলিস ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগ করবে না যাকে ট্রাম্প 'আগুন নিয়ে খেলা' বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ইতিহাসবিদ ম্যাথিউ পিন্সকার বলেন, এটি সংবিধানের দশম সংশোধনী ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অংশ ফেডারেল সরকার কি রাজ্য ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের দিয়ে নিজের আইন প্রয়োগ করাতে পারে?

এই বিতর্কের শিকড় ১৮৫০–এর দশকের পলাতক দাস আইন পর্যন্ত গড়ায়, যা অনেকটাই আজকের ‘সাংকচুয়ারি সিটি’ নীতির সঙ্গে তুলনীয়।

বলেন পিন্সকার এই সমস্যার সমাধান সোশ্যাল মিডিয়ায় গুলি ছুড়ে নয়,এটা আদালতেই নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। গৃহযুদ্ধের উপাদান?

সাইডম্যান বলেন, মিনেসোটায় যা ঘটছে তা এখনো গৃহযুদ্ধ নয়। গৃহযুদ্ধের জন্য উভয় পক্ষের টেকসই সহিংসতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, প্রশ্ন হলো ট্রাম্পবিরোধী প্রতিরোধ কি সহিংসতায় রূপ নেবে?

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কোনো বড় শহরে রাজ্য ও ফেডারেল বাহিনীর সহিংস সংঘর্ষ গৃহযুদ্ধের সূচনা করতে পারে।

আইন অধ্যাপক ক্লেয়ার ফিঙ্কেলস্টেইনের মতে, মিনেসোটার পরিস্থিতি সেই অনুশীলনের সঙ্গে ভয়াবহভাবে মিলছে বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের দায়মুক্তি সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের পর।

উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা

প্রেটির মৃত্যুর পর উত্তেজনা কমাতে উভয় পক্ষ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ট্রাম্প গভর্নর ওয়ালজ ও মেয়র ফ্রের সঙ্গে ফোনালাপের পর কিছু বর্ডার প্যাট্রোল এজেন্ট প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেন। কমান্ডার গ্রেগরি বোভিনোকে সরিয়ে হোয়াইট হাউসের সীমান্ত বিষয়ক প্রধান টম হোম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তবে রাজ্য প্রতিনিধি আইশা গোমেজ বলেন, বাস্তবে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন এখনো চলছে। তিনি এটিকে প্রশাসনের 'পিআর প্রচারণা' বলে অভিহিত করেন।

তার মতে, কমিউনিটিগুলো প্রতিবাদ নয় সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহায়তার পথ বেছে নিচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা এটাকে প্রতিবাদ বলি না। আমরা এটাকে মানুষ হিসেবে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো বলি প্রতিবেশী হয়ে থাকা, যত্ন নেওয়া।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X