

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


চারদিক থেকে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসছে কাদামিশ্রিত পানির স্রোত। পানির তোড়ে ভেসে যাচ্ছে বাড়িঘর, গাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা। এর মধ্যেও হালকা সবুজ রঙের একটি বাড়ি তখনো দাঁড়িয়ে।
বাড়িটির বারান্দায় আতঙ্কিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে কয়েকজন মানুষ। ছাদে উঠে এক নারী লাল কাপড় নাড়িয়ে দিচ্ছেন সাহায্যের সংকেত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন একটি ভিডিও ঘিরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। পরে বিবিসি ভেরিফাই জানিয়েছে, ভিডিওটি নেপালের ত্রিশুলি নদীর আশপাশের এলাকার। ভয়াবহ বন্যার সময় কয়েকজন ওই বাড়ির বারান্দায় আটকা পড়েছিলেন।
ভাইরাল ভিডিওতে তাদের পরবর্তী পরিস্থিতি দেখা যায়নি। তবে পরে পানির স্রোত কিছুটা কমলে উদ্ধারকারীরা সেখানে পৌঁছান। ভিডিওতে অন্তত তিনজন-একজন পুরুষ, একজন নারী ও একটি শিশুকে দেখা যায়। তাদের চারপাশ দিয়ে তখনো প্রচণ্ড বেগে কাদামাটি ও পানির স্রোত বয়ে যাচ্ছিল।
স্রোতের সঙ্গে বড় বড় পাথর, ধ্বংসাবশেষ এবং বিভিন্ন বাড়ির টিনের চালও ভেসে যেতে দেখা যায়। পানির সঙ্গে ভেসে আসা বিভিন্ন বস্তু বারবার বাড়িটিতে আঘাত করছিল। ফলে যেকোনো মুহূর্তে বাড়িটিও স্রোতে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
এ সময় বাড়ির ছাদে থাকা এক নারী লাল কাপড় নেড়ে সাহায্যের সংকেত দেন। পরে উদ্ধারকারীরা সেখানে পৌঁছে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করেন।
বন্যা থেকে বেঁচে ফেরাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
ভয়াবহ বন্যার পরপরই নেপালে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। দুর্গত এলাকায় সেনাবাহিনীর স্থাপন করা বিভিন্ন ক্যাম্পে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে প্রতিদিন ভিড় করছেন মানুষ। অনেকেই প্রিয়জনের সন্ধান না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন।
৪৩ বছর বয়সী সরস্বৈত ঘালে বন্যার ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ঘোলা পানি প্রবল বেগে ধেয়ে আসছিল এবং যাওয়ার সময় ভূমিকম্পের মতো মাটি কেঁপে উঠছিল। পরিস্থিতি দেখে তার মনে হয়েছিল, এই দুর্যোগ থেকে হয়তো আর বেঁচে ফেরা সম্ভব হবে না।
রয়টার্সকে তিনি জানান, আশপাশের পাহাড়ের ঢালগুলো পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। তিনি দ্রুত একটি উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকে নিজের চোখের সামনে কাদাপানির স্রোতে চারপাশের সবকিছু ভেসে যেতে দেখেন।
একই গ্রামের ১৭ বছর বয়সী ঋষিকা কালওয়ার জানান, বন্যায় তাদের পৈত্রিক বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের সংগ্রামে গড়ে তোলা সবকিছু এক মুহূর্তে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
উদ্ধারে এক লাখ ৮০ হাজারের বেশি কর্মী
নেপালে উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন। উদ্ধার তৎপরতায় ব্যবহার করা হচ্ছে প্রায় ৪০টি হেলিকপ্টার।
তবে কাদায় পুরোপুরি ডুবে যাওয়া এলাকাগুলোতে জীবিতদের সন্ধান করা উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং দুর্গত মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৫১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৮৭ জন বিদেশি নাগরিক।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকায় পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হেলিকপ্টার। তবে কিছু অঞ্চল এতটাই পানিতে তলিয়ে গেছে যে সেগুলো কার্যত জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। ফলে সেখানে হেলিকপ্টার অবতরণ করাও সম্ভব হচ্ছে না।
নেপাল সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৬২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং অন্তত ২ হাজার ৪২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
এদিকে চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে সাতজনে দাঁড়িয়েছে। সেখানে এখনো ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার অন্যতম কারণ হিসেবে একটি হিমবাহ ধসে পড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
নেপালে ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গতদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াই এখন কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।
সূত্র: বিবিসি


