রবিবার
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সমুদ্রের ওপর দিয়ে গাড়ি চলছে দুই দ্বীপের মধ্যে

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম
এস্তোনিয়ায় ‘আইস রোড’–এ চলছে গাড়িছবি: রয়টার্স
expand
এস্তোনিয়ায় ‘আইস রোড’–এ চলছে গাড়িছবি: রয়টার্স

উত্তর ইউরোপের তাপমাত্রা এতটাই কমে গেছে যে সেখানে নদী, হ্রদ এমনকি সমুদ্রের পানি পর্যন্ত বরফে পরিণত হয়েছে। আর পানি বরফ হয়ে এতোটাই শক্ত হয়ে গেছে যার ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে মানুষ এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যাচ্ছেন।

শুনতে অবাক করা হলেও এ দৃশ্য একেবারেই কাল্পনিক নয়। উত্তর ইউরোপের দেশ এস্তোনিয়ায় এখন নিয়মিত এ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।পশ্চিম এস্তোনিয়ায় বাল্টিক সাগর ও রিগা উপসাগরের মাঝামাঝি অবস্থিত সারেমা ও হিউমা দ্বীপকে সংযুক্ত করা এই রাস্তা। এস্তোনিয়ার নাগরিকেরা জমে বরফ হয়ে যাওয়া সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ ধরে গাড়ি চালিয়ে দেশটির দুই প্রধান দ্বীপের মধ্যে যাতায়াত করতে পারছেন। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘আইস রোড’।

গত রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে রাস্তাটি খুলে দেওয়া হয়। সেদিন বিকেলেই ওই পথে গাড়ির সারি দেখা গেছে। কর্তৃপক্ষ অবশ্য ঝুঁকি কমাতে ‘আইস রোড’ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে তাপমাত্রা মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকার কারণে সেখানে সমুদ্রের পানি জমাট বেঁধে বরফে পরিণত হয়েছে। এতে ফেরি চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। অন্যদিকে স্থানীয় লোকজন খুশিমতো জমাট বাঁধা বরফের ওপর দিয়ে গাড়ি চালাতে শুরু করেছেন। তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এস্তোনিয়ার ছোট্ট দ্বীপ হিউমার বাসিন্দা মাত্র ৯ হাজার। সেখানকার লোকজনকে শিশুদের স্কুলে দিতে, কেনাকাটা করতে, এমনকি এক কাপ কফি খেতে হলেও সারেমা দ্বীপে যেতে হয়। সারেমায় ৩১ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এস্তোনিয়ার মূল ভূখণ্ডে যেতে হলেও হিউমার বাসিন্দাদের সারেমা হয়ে যেতে হয়।

তাই প্রয়োজন থেকেই ‘আইস রোড’ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে হিউমার মেয়র হারগো তাসুয়া বলেন, ‘এটি আমাদের সংস্কৃতিরও অংশ।’

মেয়র হারগো তাসুয়া বলেন, ‘প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানকার স্থানীয় মানুষ—বিশেষ করে সমুদ্রের কাছাকাছি যাঁরা থাকেন, তাঁরা গ্রীষ্মকালে সমুদ্রে সাঁতার কাটেন এবং নৌকা ব্যবহার করেন। আর শীতে, সমুদ্রে গিয়ে বরফের ওপর পা রাখাটা যেন তাঁদের রক্তে মিশে আছে।’

এই সড়ক মূলত জমে যাওয়া সমুদ্রের ওপর চিহ্নিত একটি করিডর। বিশেষজ্ঞরা বরফের পুরুত্ব পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছেন, বরফের সমুদ্রের ওপর চিহ্নিত ওই অংশ গাড়ির ওজন বহন করার মতো যথেষ্ট শক্ত।

সড়ক প্রস্তুত করার কাজটি একেবারেই সহজ ছিল না। নিরাপত্তার ন্যূনতম শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের প্রতি ১০০ মিটার (৩২৮ ফুট) পরপর বরফের পুরুত্ব মাপতে হয়। নিরাপদ চলাচলের জন্য বরফের পুরুত্বের ন্যূনতম মানদণ্ড হলো ২৪ সেন্টিমিটার (৯ দশমিক ৫ ইঞ্চি)।

পাশাপাশি তাঁরা উঁচু–নিচু বরফের স্তূপ সমান করেছেন এবং ফাটল ঠিক করেছেন। আবহাওয়া এবং বরফের দৃঢ়তা সারাক্ষণ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে, আর পরিস্থিতি অনুযায়ী সড়ক সংস্কার করতে হচ্ছে।

এই পথে সর্বোচ্চ আড়াই টন ওজনের গাড়ি চলতে পারে এবং গতি হয় ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের নিচে, অথবা ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৭০ কিলোমিটারের ভেতরে থাকতে হয়। এর বাইরে যেকোনো গতি কম্পন তৈরি করে, এতে আইস রোড ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ ছাড়া গাড়িগুলো মাঝপথে থামতে পারে না এবং একটি থেকে আরেকটিকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হয়। যাত্রীরা সিট বেল্ট পরতে পারেন না এবং গাড়ির দরজা এমন হতে হয়, যেন সেগুলো সহজে খোলা যায়। কোনো কারণে দুর্ঘটনায় পড়লে যাত্রীদের দ্রুত গাড়ি থেকে বের করে আনতে এ ব্যবস্থা।

সন্তানদের নিয়ে সড়কটি ঘুরে গেছেন কাছের এলাকা তল্লিনের বাসিন্দা অ্যালেক্সেই উলিভানোভ। তিনি বলেন, ‘সড়কটি বেশ ভালো, গাড়ি চালানো সহজ ছিল। আমি আমার সন্তানদের দেখাতে চেয়েছিলাম, সমুদ্রের ওপর দিয়েও গাড়ি চালানো সম্ভব।’

মেয়র তাসুয়া জানান, শেষবার আইস রোড ব্যবহার করে দ্বীপ দুটোকে সংযুক্ত করা হয়েছিল প্রায় আট বছর আগে। তার পরের শীত মৌসুমগুলোয় তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত বেশি ছিল।

এস্তোনিয়ায় আরও দুটি বরফ সড়ক খুলে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে।

সূত্র: এপি

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X