রবিবার
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অল্প ব্যবধানে জামায়াত নেতাদের হার: ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বনাম পরিসংখ্যান

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৫ এএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

বহুল প্রতিক্ষিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি। এ নির্বাচনে ২৯৭ কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যার মধ্যে ২১২ আসনে জয়ী হয়েছে বিএনপি জোট। অন্যদিকে ৭৭টি আসন জিতেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো প্রাণহানি ছাড়া শেষ হয়েছে এ নির্বাচন। এছাড়া কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এ নির্বাচনে তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

তবে ভোটের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ নিয়ে কয়েকটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়, একাধিক আসনে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজয় হয়েছে জামায়াত। আর কারচুপির কারণেই এমন অল্প ব্যবধানে হারতে হয় জামায়াতকে।

কোথাও বলা হয়, ৫ হাজারের কম ভোটে হারানো আসনের সংখ্যা ৫৩টি। আবার কোনো কোনো পোস্টে উল্লেখ করা হয়, পিরোজপুর–২ আসনে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাত্র ৭০ ভোটে পরাজিত হয়েছেন এবং খুলনায় মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রায় ২ হাজার ভোটে হেরেছেন। এসব দাবির ভিত্তিতে উপসংহার টানা হয়, প্রকৃতপক্ষে জামায়াত জোট ১৩৫টি আসনে জয়ী হলেও ফলাফল কমিয়ে দেখানো হয়েছে।

এ ধরনের অন্তত এক ডজন পোস্ট ও মন্তব্য সংগ্রহ করে যাচাই করেছে ডিসমিসল্যাব। বিজয়ী ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রাপ্ত ভোটের পার্থক্য গণনা করে দেখা যায়, ৫ হাজারের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে মোট ২২টি আসনে।

ভাইরাল দাবিতে উল্লেখ করা ৫৩টি আসনের সঙ্গে এ সংখ্যার মিল নেই। এসব ২২টি আসনে ব্যবধান ছিল ৩৮৫ থেকে ৪ হাজার ৭০২ ভোটের মধ্যে।

জোটভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ২২টি আসনের মধ্যে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ১১টিতে। বিএনপি ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ৯টিতে। একটি আসনে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং একটি আসনে জয় পেয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। অর্থাৎ ৫ হাজারের কম ব্যবধানের আসনের অর্ধেকেই জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।

এই তালিকায় জামায়াত জোট সরাসরি পরাজিত হয়েছে ৯টি আসনে। পরাজিতদের মধ্যে রয়েছেন এনসিপির মো. আব্দুল আহাদ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ওমর ফারুক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা মামুনুল হক এবং জামায়াতে ইসলামীর ছয়জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও আছেন।

সবচেয়ে কম ব্যবধানের পাঁচটি আসনের মধ্যে মাদারীপুর–১ আসনে ব্যবধান ছিল ৩৮৫ ভোট এবং সিরাজগঞ্জ–৪ আসনে ৫৯৪ ভোট। এই দুই আসনেই বিজয়ী হয়েছেন জামায়াত বা তাদের মিত্র প্রার্থী।

অন্যদিকে কক্সবাজার–৪, চট্টগ্রাম–১৪ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৫ আসনে যথাক্রমে ৯২৯, ১ হাজার ২৬ এবং ১ হাজার ৬১ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা। ফলে স্বল্প ব্যবধানের ফলাফল দুই জোটের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়েছে।

জোটভিত্তিক গড় ব্যবধান বিশ্লেষণেও একতরফা চিত্র পাওয়া যায় না। যেসব আসনে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা পরাজিত হয়েছে, সেখানে মোট ব্যবধানের যোগফল ২৬ হাজার ৯০৭ ভোট। গড় পরাজয়ের ব্যবধান প্রায় ২ হাজার ৯৯০ ভোট।

অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা যেসব আসনে পরাজিত হয়েছে, সেখানে মোট ব্যবধানের যোগফল ৩০ হাজার ৮২০ ভোট এবং গড় পরাজয়ের ব্যবধান প্রায় ২ হাজার ৫৬৮ ভোট। অর্থাৎ স্বল্প ব্যবধানের আসনগুলোতে জামায়াত জোটের গড় পরাজয়ের ব্যবধান বিএনপি জোটের তুলনায় কম নয়।

ভাইরাল পোস্টে নির্দিষ্ট দুটি আসনের বিষয়ে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গেও আনুষ্ঠানিক ফলাফলের মিল পাওয়া যায়নি। খুলনা–৫ আসনে বিজয়ী ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর ব্যবধান ছিল ২ হাজার ৬০৮ ভোট। সংখ্যাটি ৫ হাজারের নিচে হলেও দাবিতে উল্লেখিত ২ হাজার ভোটের সঙ্গে তা পুরোপুরি মেলে না।

আবার পিরোজপুর–২ আসনে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে ৭০ ভোটে হেরেছেন বলে যে দাবি করা হয়েছে, সেটিও সঠিক নয়। সেখানে প্রকৃত ব্যবধান ছিল ৮ হাজার ২৮৮ ভোট। ফলাফল অনুযায়ী বিজয়ী প্রার্থী আহম্মদ সোহেল মনজুর পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৫ ভোট এবং শামীম সাঈদী পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৮৯৭ ভোট।

সব মিলিয়ে ২৯৭টি আসনের ফলাফল ভোটের ব্যবধান অনুযায়ী ছোট থেকে বড় ক্রমে সাজালে দেখা যায়, সবচেয়ে কম ব্যবধানের ৫০টি আসনে প্রার্থীদের হারের ব্যবধান ৩৮৫ থেকে ৯ হাজার ৫৮১ ভোট পর্যন্ত। এই ৫০টির মধ্যে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ২৪টিতে, বিএনপি জোট জিতেছে ২২টিতে, তিনটিতে স্বতন্ত্র এবং একটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে কোনো একক জোটের একচেটিয়া আধিপত্য দেখা যায় না।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫৩টি আসনে ৫ হাজারের কম ভোটে পরাজয় বা ৭০ ভোটের ব্যবধানের মতো দাবিগুলো সঠিক নয়। আনুষ্ঠানিক ফলাফলের সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত সংখ্যার উল্লেখযোগ্য অমিল রয়েছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X