রবিবার
২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুবদলে অসন্তোষ চরমে, পদ বাণিজ্যের অভিযোগ

মো. ইলিয়াস
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩৮ পিএম
লোগো।
expand
লোগো।

আওয়ামী লীগের অত্যাচার জুলুমের আঁচ লাগেনি গায়ে। ছিলেন পিঠ বাঁচিয়ে। দীর্ঘ ১৫ বছর ছিলেন না রাজনীতিতে। এর মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও ছিলেন জেলে। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের কোথাও ছিলেন না, কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পরে বাগিয়ে নিয়েছেন যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির পদ। এমন বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছে যুবদলের কমিটিতে। এসব নিয়ে তৈরি হয়েছে যুবদলে অসন্তোষ। পদ বাণিজ্যের অভিযোগ করছেন পদবঞ্চিত নেতারা।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ ১৫ বছর রাজনীতিতে না থেকেও সহ সভাপতির পদ বাগিয়ে নিয়েছেন আতিকুর রহমান আতিক। দীর্ঘ ১০ বছর একেবারেই রাজনীতিতে না থেকেও যুগ্ম সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন মো. কামরুজ্জামান, আজহারুল ইসলাম মিলন, মনিরুল ইসলাম সোহাগ। ২০১৩ এবং ১৪ সালে আন্দোলন চলাকালে বিদেশ চলে যান আবুল মনসুর খান দীপক। ৫ আগস্টের পর দেশে এসে বাগিয়ে নেন যুগ্ম সম্পাদকের পদ। আন্দোলনের সময় বিদেশে থেকেও সুদিনে দেশে এসে যুগ্ম সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন শামসুজ্জোহা সুমন।

এদিকে প্রবাসে থেকেও সহ সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন আবু সাইদ আহমেদ ও রহিম উদ্দিন। সৌদি আরব প্রবাসী হারুন অর রশিদ হিরু যুগ্ম সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সুনজরে থেকে তারা পদ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বর্তমান কমিটির এক নেতা বলেন, যারা আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত ছিলেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। যারা দুর্দিনে আন্দোলন সংগ্রাম ছেড়ে বিদেশে চলে যায়, তাদেরকে মূল্যায়ন কারা হয়েছে। সামনেও কখনো দলের দুর্দিন আসলে তারা আরার চলে যাবেন না এর নিশ্চয়তা কী এমন প্রশ্নও রাখেন তিনি।

যেসব নেতাকে নিয়ে সাধারণ কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন, সহ সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম দুলাল, আব্দুল জব্বার খান, রফিক আহমেদ ডলার। তারা গত কমিটির সদস্য ছিলেন। সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের সুনজরে পদায়ন হয়েছেন বলে অভিযোগ পদবঞ্চিত নেতাদের। সহ সভাপতি মোহাম্মদ ফিরুজ আব্দুল্লাহ, তিনি গত কমিটির সদস্য। এর আগে কোনো ইউনিটে কোনোদিন রাজনীতি করেননি। ইতোমধ্যে যুবদলের পদ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সারাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে তিনি ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে যুগ্ম সম্পাদক মাইনউদ্দিন রুবেল যুবদলের পদ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সারাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যুগ্ম সম্পাদক গোলাম মোস্তফা। গত ১২ বছরে কোনো কর্মসূচিতে অংশ না নিলেও তাকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল ওহাব দীর্ঘদিন রাজনীতির সাথে সক্রিয় না থাকলেও পদ বাগিয়ে নেন তিনি।

এছাড়া অপরিচিত, মিছিল-মিটিং না করেও সহ সাধারণ সম্পাদকের পদ পেয়েছেন রাহাদুল আলম খান, আলমগীর কবির সেলিম, মজিবুর রহমান ভুঁইয়া সবুজ, দীর্ঘদিন রাজনীতিতে না থেকেও সহ সাধারণ সম্পাদকের পদ পেয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন চয়ন, অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান জুয়েল। অন্যদিকে সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পেয়েছেন সোহেল আলম, আরিফুর রহমান সোহেল। তারা গত ১২ বছর একেবারেই রাজনীতিতে ছিলেন না। অভিযোগ রয়েছে সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের সুনজরে ছিলেন তারা। সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক খন্দকার রিয়াজ অনৈতিকতার সুবিধা দিয়ে পদ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সহ প্রচার সম্পাদক তারেকুর রহমান তারেক। তিনি কোনো ইউনিটে কখনো রাজনীতি না করেও পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। সহ সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক সাইদুর রহমান সোহেল মোনায়েম মুন্নার সুনজরে কমিটিতে এসেছে। শিল্প বিষয়ক সম্পাদক কারিমুল হাই নাইম। কোনো সময়ই মিছিল-মিটিংয়ে অংশ গ্রহণ করেননি। সহ-ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক মেজবাহউদ্দিন মেজু একেবারেই অপরিচিত। ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক কামরুজ্জামান নান্নু। সাধারণ সম্পাদকের সুনজরে নেতা হয়েছেন বলে অভিযোগ পদবঞ্চিত নেতাদের।

এছাড়া পাঠাগার সম্পাদক হেদায়েত হোসেন ভুঁইয়া। তিনি যুবদলের সাবেক সদস্য। এর আগে কোনো ইউনিটে কোনো রাজনীতি করেনি। সভাপতি মোনায়েম মুন্নার ‘সুনজরে’ নেতা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইমরান আহমেদ প্রিন্স। তিনি কমিটির পদ দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সহ কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক মো. জাহিদ হাসান। তিনি একেবারেই অপরিচিত, মিছিল-মিটিংয়ে তাকে কখনো দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করছেন পদবঞ্চিত নেতারা।

অভিযোগ রয়েছে, সদস্য নাজিমুদ্দিন মিঠু, মাহমুদুল করিম সজল, সালাহউদ্দিন আহমেদ শাহীন তারা একেবারেই অপরিচিত, মিছিল-মিটিংয়ে তাদের দেখা যায়নি। একযুগ ধরে রাজনীতিতে নেই সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ শাহীন। এছাড়া অতীতে রাজনৈতিক পদ পদবি ছিল না, একজন চাকুরীজীবি হয়েও সদস্য পদ বাগিয়ে নিয়েছেন ফখরুল বিন খালেক।

জাতীয়তাবাদী যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণার প্রায় দুই বছর পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। গত ৪ জুন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আবদুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর থেকেই খোদ সংগঠনের ভেতরেই ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ও গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সামনে একাধিক অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন পদবঞ্চিত ও বিক্ষুব্ধ নেতারা।

গত ২২ জুন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর সাথে সাক্ষাৎ করে পদবঞ্চিত যুবদল ও সাবেক ছাত্রদল নেতারা কমিটি বাতিলের দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করেন। অভিযোগপত্রে পদবঞ্চিতরা বলেছেন, ঘোষিত কমিটি একটি ‘মাই ম্যান’ বা পকেট কমিটি। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বা অনুগত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে ও তারও আগে ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের ‘বিশেষ সরকারে’র সময় মাঠের ত্যাগী ও সিনিয়রদের অবমূল্যায়ন করে জুনিয়রদের সাংগঠনিক দক্ষতাকে গুরুত্ব না দিয়ে ‘ব্যক্তিগত লবিং’ প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে বলে ক্ষুব্ধরা অভিযোগ করেছেন।

পদবঞ্চিত ও বিক্ষুব্ধ নেতাদের অভিযোগ, যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বা অনুগত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। সিনিয়রদের অবমূল্যায়ন করে জুনিয়রদের উচ্চপদ ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে গুরুত্ব না দিয়ে ‘ব্যক্তিগত লবিং’ প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের বিভিন্ন আসনে যুব দলের পক্ষ থেকে যাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদেরকেও কমিটিতে স্থান দেয়া হয়নি। এমন বেশ কিছু অভিযোগ তুলে ধরে পদবঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ নেতারা কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের দাবি জানান।

পদবঞ্চিত নেতাদের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে যারা বছরের পর বছর জেল-জুলুম, হুলিয়া ও একাধিক রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছেন, তাদের এই কমিটিতে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে যাদের ভূমিকা ছিল না, যারা দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন, এমনকি অচেনা মুখ এবং নানা অভিযোগে বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি হত্যা মামলা বা অন্যান্য গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের কমিটিতে স্থান দেওয়ার অভিযোগও করছেন পদবঞ্চিতরা।

তবে যুব দলের কমিটি গঠনে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন। তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। যারা বঞ্চিত হয় তারা সব সময় কমিটি গঠনের বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলেন। কমিটিতে যাদেরকে রাখা হয়েছে তারা সকলেই যোগ্য। আর যোগ্য বলেই তারা কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। কারো নিকট কোনো প্রমাণ থাকলে লিখিতভাবে অভিযোগ দেয়ার দাবি জানান তিনি।

নূরুল ইসলাম নয়ন বলেন, ছাত্রদলের বিগত তিন থেকে চারটি কমিটিতে যারা ছিলেন তারা সকলেই যুবদলের কমিটিতে আসতে চাচ্ছেন। সকলকে তো আর কমিটিতে স্থান দেয়া সম্ভব নয়। যারা বাদ পড়েছেন তাদের কমিটিতে রাখতে পারলে ভালো হতো। ২৫১ সদস্যের যুবদলের কমিটি দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও ১৫১ সদস্যের কমিটি হয়েছে। বর্তমান কমিটিতে যাতে আরও ১০০ জনকে যুক্ত করা হয় সেই বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে আলোচনা করা হবে বলেও জানান যুবদলের সাধারণ সম্পাদক।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
South Africa VS Canada
Scheduled
29 Jun, 01:00 AM
VS
World Cup