বুধবার
২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যেমন ছিলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

যাকারিয়া মাহমুদ
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৩ পিএম
প্রতীকী ছবি, সংগৃহীত
expand
প্রতীকী ছবি, সংগৃহীত

তিনি পৃথিবীতে আসার আগেই পিতৃহারা। মায়ের চিরবিদায় শৈশবেই—বয়স যখন ছয়। বাবা-মায়ের তিরোধানের পর তিনি বেড়ে ওঠেন দাদা আবদুল মুত্তালিবের তত্ত্বাবধানে। বয়স যখন আট বছর দুমাস দশদিন, দাদাও চলে যান পরপারে। অতঃপর তাঁর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন চাচা আবু তালেব।

তিনি আল-আমিন—বিশ্বস্ত। সাদিক—সত্যবাদী। উদার ও আমানতদার। সহনশীল ও কোমলপ্রাণ। ধৈর্যশীল, লাজুক। দুনিয়াবিমুখ, আল্লাহভিরু। ক্ষমা ও সহিষ্ণুতা তাঁর অনুপম স্বভাব। বিনয় ও নম্রতায় তিনি অতুল দৃষ্টান্ত। নজিরবিহীন মহানুভবতার মূর্তমান প্রতিচ্ছবি। বীরত্ব, বাগ্মিতা, বয়ান ও বক্তৃতায় তিনি সর্বসেরা। স্নেহ-মমতা, দয়া ও ভালোবাসার অতুলনীয় চিত্র। তিনি সত্যের ফেরিঅলা। শান্তি-সুখের অগ্রদূত। শ্বাশত পয়গামের ধারক, বাহক। রব্বে কারিম তাঁকে সৃজন করেছেন বিশেষ প্রক্রিয়ায়। আপন কুদরতে করেছেন লালন।

তিনি ধনীর জন্যে যেমন মুক্তির পরোয়ানা, গরীবের জন্যেও সুসংবাদের বাহক। অনাথ-অসহায়ের আজীবন সঙ্গী। তিনি সম্পর্কের রক্ষাকবচ। আত্মীয়তার বাঁধন তাঁর কাছে নিরাপদ। ছিঁড়ে যাবার ভয় নেই। কারণ, তিনি ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’—বিশ্ববাসীর রহমত। তাঁর আদর্শ সর্বশ্রেষ্ঠ। স্বয়ং আল্লাহই বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তুমি অনুপম আদর্শে অধিষ্ঠিত।’ (সুরা কলাম: ৬৮)

তিনি ব্রহ্মাণ্ডের শ্রেষ্ঠ প্রবাদপুরুষ। মান্যবর তাঁর ব্যক্তিত্ব। আদর্শ অনুসরণীয় এবং অনুকরণীয়। কেননা, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্যে রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’। (সুরা আহজাব: ৩৩)

কোরআনই ছিল তাঁর আদর্শ ও চরিত্র। যে বিষয়ে কোরআন সন্তুষ্ট, তিনিও তাতে সন্তুষ্ট। যে বিষয়ে কোরআন কঠোর, তিনিও তাতে কঠোর।

ইতিহাসের এমন এক বিষাদলগ্নে পৃথিবীতে তাঁর আগমন—চারদিকে যখন মূর্খতা ও ভ্রষ্টতার সয়লাব। অন্যায়-অবিচারের হর্ষধ্বনি। খুন, লুণ্ঠন, জুয়া, ব্যভিচার ও মূর্তিপূজা—যখনকার নৈমিত্তিক কাজ। এসবের মাঝেই তিনি বেড়ে ওঠেন—পবিত্র চেতনায়। পাপাচারের অপবিত্রতা ছিল তাঁর ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্বয়ং আল্লাহ তাঁর তত্ত্বাবধায়ক, রক্ষক।

তিনি শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক। মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে ‘মদিনাতুর রাসুল’ নামক যেই রাষ্ট্র তিনি গঠন করেছিলেন, আজও তা বিশ্ববাসীর জন্য দৃষ্টান্ত। সে রাষ্ট্রে ছিল না জুলুম। ছিল না অন্যায় অবিচার। দুর্বলদের ওপর ছিল না সবলদের নিপীড়ন। ধনী-গরীব, কালো-শাদা, মনিব-গোলাম নির্বিশেষে সমাজের সমস্ত মানুষের অবস্থান ছিল একই কাতারে। একই সারিতে।

তিনি শুদ্ধভাষী। কথায় ছিল না আঞ্চলিকতা, জড়তা বা অস্পষ্টতা। বলতেন থেমে থেমে, মধ্যম গতিতে। যে-কেউ গুনে ফেলতে পারত, তাঁর উচ্চারিত প্রতিটা শব্দ। শ্রোতাগণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতো তাঁর মুক্তোঝরানো বাণী। বোঝার সুবিধার্থে তিনি একই কথা বলতেন তিনবার। তবে অধিক সময় মৌনতা অবলম্বন করতেন, চুপ থাকতেন। অপ্রয়োজনীয় কথা-কাজ ছিল তাঁর স্বভাব বিরোধী। যা বলতেন, পরিমিত, সারগর্ভ। না-বেশি, না-কম।

তিনি হাসতেন, মুচকি হাসি। সর্বোচ্চ মাড়ি দেখা যেত। হাসির মতো তাঁর কান্নাও ছিল মৌন, আওয়াজহীন। তবে জাঁতা পেষবার মতো আওয়াজ হতো বুকের ভেতর। আর চোখের কার্নিশ বেয়ে নেমে আসতো অঝোরধারার অশ্রু। তিনি কাঁদতেন, রাতের গভীরে, নামাজান্তে, কোরআন তেলাওয়াতে, সেজদায় লুটিয়ে। কাঁদতেন, উম্মতের চিন্তায়, কখনোবা কবরপারে দাঁড়িয়ে মৃতের জন্য অন্তহীন করুণায়।

তিনি হাসতেন। মজা করতেন। কৌতুক করতেন। তবে মিথ্যে বা অর্থহীন ছিল না তাঁর ঠাট্টা-কৌতুক। বরং তাঁর অন্যান্য কথা ও কাজের মতোই ছিল অর্থবোধক, শিক্ষণীয়।

তিনি নিজের কাজ নিজেই করতেন। জামা-জুতো নিজেই সেলাতেন। পশুর দুধ দোহন করতেন। কাপড় কাচতেন। সংসারের কাজ করতেন। ঘরকন্যার কাজে সহযোগিতা করতেন। মসজিদ নির্মাণকালে সাহাবিদের সঙ্গে ইট-পাথর টানতেন। অনাথ-অসহায়কে সাহায্য করতেন। অকাতরে দান করতেন। তাঁর কাছে এসে শূন্য হাতে ফিরে যেত না কেউ।

তিনি রোগীর সেবা করতেন। সাহাবিদের তো বটেই; শত্রুপক্ষের কেউ অসুস্থ হলেও তিনি দেখতে যেতেন। রোগীর শিয়রে বসে মাথায় হাত বোলাতেন। রোগমুক্তির দোয়া করতেন।

পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতায় বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। পরিপাটি থাকতেন। তিনিই বলেছেন, ‘পবিত্রতা ইমানের অঙ্গ’।

তিনি মেসওয়াক করতে ভালোবাসতেন। ঘুম থেকে জেগে, অজু ও নামাজের সময় মেসওয়াকের বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। মেসওয়াকের ফজিলত বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘মেসওয়াক-সহ নামাজের সওয়াব মেসওয়াক-ছাড়া নামাজের থেকে সত্তরগুণ বেশি। এমনকি জীবনের অন্তিমকালেও তিনি মেসওয়াক করেছন। তখন মেসওয়াক চিবিয়ে নরম করার শক্তি ছিল না তাঁর গায়ে। তাই হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা চিবিয়ে নরম করে দিয়েছিলেন।

তিনি ছোটদের আদর করতেন। ভালোবাসতেন। স্নেহ-মমতায় আগলে রাখতেন। তাদের দুষ্টমিতে বিরক্ত হতেন না। তিনি যখন নামাজে সেজদায় যেতেন, হাসান-হুসাইন তাঁর পিঠে চড়ে বসত। তিনি কিছু বলতেন না। সন্তর্পণে পিঠ থেকে নামিয়ে সেজদা থেকে উঠতেন। কখনোবা তাঁরা পিঠ থেকে সরে যাওয়া অবধি সেজদায় কাটিয়ে দিতেন। তাঁর মমতার চাদর ছিল সকল শিশুদের ওপর। হোক-না সে শিশু নাজায়েজ সন্তান। সাহাবিগণ তাঁদের শিশুদের নিয়ে এলে তিনি কোলে তুলে নিতেন। চুমু খেতেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দিতেন। সাহাবিদের দীক্ষা দিতেন ছোটদের প্রতি স্নেহশীল হবার। তিনি বলতেন, ‘সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে ছোটদের স্নেহ করে না।’

সন্তানদের আবেগ-অনুভূতির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সচেতন। তাদের সাথে হাসিখুশি ও প্রফুল্লচিত্ত থাকতেন। সৎকাজের উপদেশ দিতেন। নির্দেশ দিতেন অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকার। সর্বদা জিকির-আজকার ও দোয়ার প্রতি উৎসাহ জাগাতেন। বিপদে ধৈর্যধারণ, সর্বদা সদাচরণ ও সহনশীলতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। ছেলে-মেয়েদের হাদিয়া-তোহফা দিতেন।

তিনি যেমন শ্রেষ্ঠ বাবা ছিলেন। ছিলেন শ্রেষ্ঠ ভাই এবং বন্ধু। তেমনই ছিলেন শ্রেষ্ঠ গৃহকর্তা বা স্বামী। তিনি পৃথিবীর সমস্ত স্বামীর চরিত্রের মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন এভাবে—‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। আর স্ত্রীর কাছে উত্তম হওয়ার বিচারে আমিই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম’। (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)

স্ত্রীদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল বড় মধুর। প্রেম-মমতা ও ভালোবাসায় ভরপুর। ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে একসঙ্গে এগারো স্ত্রী ছিল তাঁর। তাঁর সহধর্মিণী হবার জন্য প্রতিটা নারীই ছিল বেকারার। কখনো কোনো স্ত্রীর হক নষ্ট হতে তিনি দেননি। অধিকার খর্ব করেননি। স্ত্রীদের প্রাপ্য আদায়ে তিনি সর্বদা সচেতন। কোনো স্ত্রী তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল না। সাংসারিক নানা কারণে হঠাৎ-হঠাৎ টুকটাক মনোমালিন্য হতো বৈকি; তা অধর্তব্য।

তিনি স্ত্রীদের এঁটোমাখা খেতেন। তাদের চিবানো হাড় চিবোতেন। পানপাত্রের যে স্থানে স্ত্রী মুখ লাগাতেন, তিনি সেখানে মুখ লাগিয়ে পানি পান করতেন। স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে ঘুমাতেন। আম্মাজান হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনা বলেন, ‘নবীজি আমার কোলে হেলান দিয়ে কোরআন তেলাওয়াত করতেন, অথচ আমি ঋতুবতী!’

স্ত্রীর ঋতু চলাকালেও তিনি তাদের সাথে একই বিছানায়, একই চাদরের নিচে শুতেন। ঘেন্না করতেন না। এড়িয়ে যেতেন না। বরং অন্য সময়ের মতোই স্ত্রীদের সাথে সুন্দর আচরণ করতেন। স্বাভাবিক থাকতেন।

স্ত্রীদের সাথে তিনি একই থালায় খেতেন। একই পাত্র থেকে পানি নিয়ে গোসলও করতেন। আম্মাজান হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ‘আমি ও রাসুল একই পাত্র থেকে পানি নিয়ে গোসল করতাম। (পানি নেয়ার ছোট) পাত্রটি আমার ও তাঁর মধ্যে থাকত। কখনো তিনি আগে পানি নিতেন, কখনোবা আমি। এমনকি তিনি বলতেন, আমার জন্য রাখো! কখনো আমি বলতাম, আমাকে নিতে দিন! (বুখারি: ২৫০, মুসলিম: ৩২১)

হজরত উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি ও রাসুল একই পাত্র থেকে পানি নিয়ে গোসল করতাম! (সহিহ মুসলিম: ৩২২)

নৈশভ্রমণে তিনি স্ত্রীদের সাথে গল্পগুজব করতেন। কখনো দৌড় প্রতিযোগিতাও করতেন। যেমন হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার হাদিস—আমি আল্লাহর রাসুলের সঙ্গে একবার সফরে বের হলাম। তখন আমি কিশোরী। হালকা গড়নের ছিলাম। শরীরে মেদ জমেনি। রাসুল সাহাবিদের বললেন, ‘তোমরা এগিয়ে যাও!’ তারা এগিয়ে গেলে রাসুল আমায় বললেন, ‘চলো দৌড় প্রতিযোগিতা করি!’ আমরা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হই। দৌড়ে হারিয়ে দিই তাঁকে। তিনি তখন চুপ করে থাকলেন। কিছু বললেন না। (এরপর অনেক সময় বয়ে যায়।) আমার শরীর বাড়তে থাকে। দেহে জমে মেদ। আগের সেই প্রতিযোগিতার কথা ভুলে যাই ততদিনে। অতঃপর কোনো একটা সফরে, আমি সেবারও রাসুলের সাথে ছিলাম। রাসুল সাহাবিদের বললেন, ‘তোমরা এগিয়ে যাও!’ তারা এগিয়ে গেলে, রাসুল আমায় বললেন, ‘চলো দৌড় প্রতিযোগিতা করি!’ তারপর আমরা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হই। কিন্তু এবার হেরে যাই আমি। রাসুল তখন হাসতে হাসতে বললেন, ‘এটা সেবারের প্রতিশোধ!’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৫৭৮)

সেবক-সেবিকা বা ক্রীতদাস-দাসীদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল পিতৃসুলভ। তাদের সাথে হাসিখুশি কথা বলতেন। আদর করে ডাকতেন। কোমল ভাষায় নির্দেশ দিতেন। হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি দশবছর নবীজির খেদমত করেছি। একবারও তিনি আমায় প্রশ্ন করেননি, ‘আনাস, এটা কেনো করেছো? বা এটা কেনো করোনি?’

খাদেম-সেবকদের কেউ অসুস্ত হলে দেখতে যেতেন। অন্নবস্ত্রে তাদের সাথে সমতা রক্ষার কথা বলতেন। খাদেমদের চাওয়া-পাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। তিনি তাদের এতটা ভালোবাসতেন, আপন পরিবার ছেড়ে নবীজির কাছে থাকাতেই তারা খুঁজে পেত জীবনের স্বার্থকতা। যেমন হজরত জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা। শৈশবে মরুদস্যুদের হাতে বন্দি হয়ে তিনি মক্কায় আসেন। মক্কার বাজার থেকে তাঁকে ক্রয় করেন, আম্মাজান হজরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা। কিনে হাদিয়া দেন নবীজিকে। তারপর নবীজির সান্নিধ্যে কেটে যায় তার অনেক বছর। এরমধ্যে তার খোঁজে তার পরিবারের লোকেরা চষে বেড়ায় আরবের এ-প্রান্ত থেকে এ-প্রান্ত। একসময় যখন জানতে পারে, জায়েদ আছে মক্কায়, মুহাম্মদ নামী এক অভিজাত ব্যক্তিত্বের মালিকানায়, তারা ছুটে আসে। নিজেদের পুত্রকে দাসত্বের শেকলমুক্ত করতে নিয়ে আসে পর্যাপ্ত অর্থ-পয়সাকড়ি। জায়েদকে ডাকা হয়। বহুবছর পর সন্তানকে কাছে পেয়ে বাবা ও চাচা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর অবস্থাও অনুরূপ।

নবীজি বললেন, ‘জায়েদ, আমি তোমাকে স্বাধীনতা দিচ্ছি। তুমি চাইলে তোমার বাবার সাথে পরিবারে ফিরে যেতে পারো, চাইলে এখানেও থাকতে পারো।’

জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আমি বরং আপনার কাছেই থাকব।’

পুত্রের মুখে এমন কথা শোনে পিতা হারেসা তাজ্জব বনে গেলেন। বললেন, ‘জায়েদ, তুমি দাসত্বকে স্বাধীনতা, আপন পিতামাতা ও পরিবারের ওপর প্রাধান্য দিচ্ছো!?’

জবাবে জায়েদ বললেন, ‘আমি এ-ই মহান লোকটির মধ্যে যা পেয়েছি, তাতে আমি কক্ষনোই তাঁর সঙ্গ ছাড়তে পারব না।’

এমনই ছিল মানুষের প্রতি নবীজির ভালোবাসা। তাঁর অনুরূপ ভালোবাসা ছিল, পশুপাখি ও প্রকৃতির প্রতিও। সবার প্রতি তাঁর ভালোবাসার সমতা ছিল এমন—প্রত্যেকেই মনে করতো, ‘নবীজি তাকেই সবচে’ বেশি ভালোবাসেন’। কেননা, তিনি রহমাতুল্লিল আলামিন—সবার জন্য রহমত। সবার জন্য তাঁর ভালোবাসা। …

তিনি অতি লম্বা ছিলেন না। ছিলেন না বেঁটেও। না ছিলেন অতি মোটা বা হ্যাংলা। মাঝারি গড়নের ছিল দেহ-গড়ন। তবে লোকদের সাথে দাঁড়ালে তাঁকে মনে হতো সবার উচু। গায়ের রং ছিল দুধে আলতা। উজ্জ্বল—গৌরবর্ণ। চৌদ্দশী চাঁদের মতো ঝলমলে মুখাবয়ব।

তাঁর চুল ও দাঁড়ি ছিল ঘন, কুচকুচে কালো। ঈষৎ ঢেউখেলানো বাবরি। কখনো কান, কখনো ঘাড়, কখনোবা কাঁধ। মাথা মুণ্ডন করেছেন শুধু হজম ও ওমরায়। তিনি চুলে তৈল দিতেন। পরিপাটি করে রাখতেন। চুলগুলো ছেড়ে দিতেন পেছন দিকে। প্রথম জীবনে সিঁথি না কাটলেও, শেষ জীবনে কাটতেন। ইন্তেকালের সময় তাঁর দাড়ি ও চুলে পাক ধরেছিল বিশটিরও কম চুল।

মাথা মোবারক বড় ছিল। প্রশস্ত চেহারা। প্রশস্ত ললাট। ভ্রূদ্বয় ঈষৎ বাঁকা, সরু, ঘন ও পৃথক পৃথক। একটি রগ ছিল ভ্রূদ্বয়ের মাঝখানে। ক্রোধের সময় ফুলে ফুলে ওঠতো সে রগ। চোখ ছিল গাঢ় কালো। শাদা অংশে ছিল লাল রেখা। নাক মোবারক কিছুটা উচু। সূর্যের আলোয় রুপা চমকানোর মতো সর্বদা নুর চমকিত ছিল তাঁর নাক। দূর থেকে কেউ হঠাৎ দেখলে ভাবত, বোধহয় বেশ উচু। আসলে তা জ্যোতির্ময়। ঝকঝকে শাদা ছিল দাঁত। সামনের দাঁতে ছিল কিছুটা ফাঁকা। ছিল নিখুঁতভাবে সাজানো দাঁতের পাটি।

চওড়া কাঁধ। প্রশস্ত বক্ষ। মোটা ও মজবুত জোড়ার হাড়। বুক-পেট ছিল সমান। পশমের লম্বা সারি ছিল বুক থেকে নাভি পর্যন্ত। ঘাড় বরাবর সামান্য নিচে ছিল মোহরের নবুওয়ত। ডিম্বাকৃতির—উন্থিত গোশতের টুকরা। সবসময় নুর চমকাত তাতে।

শরীর ছিল তুলতুলে। ছিল অতিরিক্ত লোম থেকে মুক্ত। বাহু, কাঁধ ও বক্ষের উপরিভাগে ছিল কিছুটা লোম। লম্বা লম্বা ছিল হাত-পায়ের আঙুল। পা ছিল মসৃন। পায়ের তলদেশ কিছুটা গভীর। মাটিতে কদম ফেলতেন খুব আস্তে আস্তে। তবে হাঁটতেন দ্রুত। হাঁটার সময় সামনের দিকে ঝুঁকে পড়তেন। যেন উপর থেকে নামছেন নিচের দিকে। আকাশের তুলনায় মাটির দিকেই দৃষ্টি থাকত অধিক সময়। হাঁটার সময় সাহাবিদের সামনে রাখতেন। কারো সাথে সাক্ষাৎ হলে, নিজেই প্রথম সালাম দিতেন। তিনি যে পথে হেঁটে যেতেন, দীর্ঘ সময় সে পথে মেশকের ঘ্রাণ ছড়িয়ে থাকত। ঘ্রাণ শুঁকে লোকে বলতে পারত- এ পথ ধরে আল্লাহর রাসুল গিয়েছেন।

সর্বোপরি, তাঁর অবয়ব ছিল নিখুঁত নির্মাণ। ঠিক যেমন, তাঁর চরিত্র ছিল নিষ্কলুষ। তাঁর দৈহিক সৌন্দর্য নিয়ে যেমন কারো প্রশ্ন ছিল না। তেমনই দ্বিমত ছিল না কারো তাঁর অনুপম আচরণ ও চারিত্রিক নিষ্কলুষতা নিয়েও। কারণ, তিনি জগতের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। নবী ও রাসুল। রব্বে কারিমে তাঁকে নিজ হাতে করেছেন সৃজন। তাই তো, সবাই তাঁকে ভালোবাসে। হৃদয় দিয়ে শ্রদ্ধা করে। জীবন বাজি রেখে এগিয়ে যায় তাঁর মর্যাদা রক্ষায়।

তাঁকে যারা ভালোবাসে, তিনি তাদের ভালোবাসেন। তাদের জন্য কাঁদেন। রবের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। রোজ হাশরেও তিনি তাদের ভালোবাসবেন। ভালোবেসে কাছে টানবেন। হাউজে কাউসারের অমিয় সুধায় তৃপ্ত করবেন তাদের প্রাণ। কারণ, তিনি যে রহমাতুল্লিল আলামিন। বিশ্ববাসীর রহমত।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
ফজর --:--
জোহর --:--
আছর --:--
মাগরিব --:--
ঈশা --:--
পরবর্তী ওয়াক্ত শুরু হতে বাকি: মাগরিব --:--:--
সেহেরির শেষ সময় --:--
ইফতার --:--
ইফতার শুরু হতে বাকি
--:--:--
ঘণ্টা মিনিট সেকেন্ড
⏳ লোড হচ্ছে...
⛔ সংযোগ সমস্যা।