


সাইয়্যেদা নাফিসা বিনতে আবুল হাসান (রহ.) ছিলেন রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রপৌত্র হজরত হাসানের (রা.) বংশধর। জ্ঞান, পরহেজগারী, অনন্য সাধনার কারণে ইতিহাসে তিনি ‘নাফিসাতুল ইলম’ (ইলমের মণি বা রত্ন) এবং ‘কারিমাতুদ-দারাইন’ (দুই জাহানের মর্যাদাময়ী) নামে পরিচিত।
জন্ম ও শৈশব
হিজরি ১৪৫ সালের ১১ রবিউল আউয়াল পবিত্র মক্কা নগরীতে সাইয়্যেদা নাফিসা (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন। যখন তার জন্ম হয়, তখন তার বাবা হাসান আল-আনওয়ার (রহ.) মসজিদুল হারামে বসে মানুষকে কোরআন ও ফিকহের দরস দিচ্ছিলেন। এক দাসি এসে তাকে জানায়, তার ঘরে একটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। এই আনন্দের সংবাদ শুনে হাসান আল-আনওয়ার সাথে সাথে আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন এবং নিজের আবেগ ও শুকরিয়া প্রকাশ করে মেয়ের নাম রাখেন ‘নাফিসা’ অর্থাৎ অনুপম, মহামূল্যবান ও পরম পবিত্র। কন্যাসন্তান জন্মের পরপরই আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল-মানসুরের পক্ষ থেকে একজন বিশেষ দূত এসে হাসান আল-আনওয়ারকে মদিনা মুনাওওয়ারার গভর্নর বা আমির হিসেবে মনোনীত করার চিঠি পৌঁছে দেন। শৈশবের সূচনাতেই নাফিসাকে মদিনায় নিয়ে আসা হয়। রাসুলুল্লাহর (সা.) শহরে তিনি বেড়ে উঠতে থাকেন।
মদিনা তখন ছিল মুসলিম বিশ্বের ইলম ও ফিকহের প্রাণকেন্দ্র। প্রখর মেধা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী সাইয়্যেদা নাফিসা (রহ.) নিয়মিত প্রবীণ আলেমদের আলোচনা থেকে জ্ঞান আহরণ করতেন।
তার বাবা মদিনার শাসনকর্তা হাসান আল-আনওয়ারের (রহ.) ঘরে প্রতিদিন ওই সময়ের সেরা ফকিহ, মুহাদ্দিস, জাহেদ ও কবিরা একত্র হতেন। সাইয়্যেদা নাফিসা (রহ.) পর্দার অন্তরাল থেকে তাদের গভীর তত্ত্বপূর্ণ আলোচনা শুনতেন, জটিল প্রশ্নাবলি নোট করতেন এবং রাসুলুল্লাহর (সা.) হাদিস ও আসারের ভাণ্ডার নিজের অন্তরে সংরক্ষণ করতেন।
তখনকার মদিনার প্রখ্যাত মুহাদ্দিসক ও ফকীহ ইমাম মালেকের (রহ.) সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তিনি ইমাম মালেকের কাছ থেকে ফিকহ ও হাদিস শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
সাইয়্যেদা নাফিসা (রহ.) বিয়ের উপযুক্ত বয়সে উপনীত হলেন। আহলে বাইতের বিশিষ্ট তরুণরা এবং কোরাইশ বংশের বড় বড় সম্ভ্রান্ত ও ধনী যুবকেরা বিবাহের প্রস্তাব পাঠাতে শুরু করেন। তার পরহেজগারি, তাকওয়া ও ইলমের সুবাস ততদিনে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু তার বাবা হাসান আল-আনওয়ার এমন এক পাত্রের অপেক্ষায় ছিলেন, যিনি ইলম, বংশমর্যাদা ও আমানতদারীতে সাইয়্যেদা নাফিসার উপযুক্ত বা সমকক্ষ হবেন।
অবশেষে ১৬১ হিজরির ১ রজব রাসুলুল্লাহর (সা.) অপর দৌহিত্র ইমাম হোসাইনের (রহ.) বংশধর ইসহাক ইবনে জাফর আস-সাদিকের (রহ.) সাথে তার বিবাহ সম্পন্ন হয়। ইসহাক ছিলেন অত্যন্ত ইবাদতগুজার ও প্রখ্যাত মুহাদ্দিস। তার সততা, ইমানি দৃঢ়তা ও নিখাদ চরিত্রগুণে মুগ্ধ হয়ে মানুষ তাকে ‘আল-মু’তামান’ (আমানতদার বা পরম নির্ভরযোগ্য) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। বর্ণিত আছে, ইসহাক ইবনে জাফরের শারীরিক অবয়ব ও চেহারা রাসুলুল্লাহর (সা.) সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল।
এই মোবারক বিবাহের মাধ্যমে একই ছাদের নিচে নবীবংশের দুই রত্ন হাসান ও হোসাইনের (রহ.) পবিত্র নূরের এক অভূতপূর্ব মিলন ঘটে। তাঁদের ঘরে কাসিম ও উম্মে কুলসুম নামে দুটি সন্তানের জন্ম হয়।
মিশরের জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার বাতিঘর
রাজনৈতিক অস্থিরতা, মদিনার প্রেক্ষাপট পরিবর্তন এবং বাবা হাসান আল-আনওয়ারের গভর্নর পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর নাফিসার মদিনায় অবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সাইয়্যেদা নাফিসা (রহ.) স্বপরিবারে মদিনা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সাইয়্যেদা নাফিসার (রহ.) তাকওয়া ও জ্ঞানের সুখ্যাতির কারণে মিশরীয়দের অনেকে হজের মৌসুমে মদিনায় এলে তার সঙ্গে দেখা করতেন এবং তাকে মিশরে যাওয়ার দাওয়াত দিতেন।
তিনি তাদের দাওয়াত কবুল করে বলতেন, ইনশাআল্লাহ, আমি আপনাদের দেশে যাবো। আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদে মিশরের প্রশংসা করেছেন এবং আমার দাদা রাসুলুল্লাহ (সা.) মিশরের অধিবাসীদের সাথে ভালো ব্যবহারের ওসিয়ত করে বলেছেন, ‘তোমরা যখন মিশর বিজয় করবে, সেখানকার অধিবাসীদের সাথে উত্তম আচরণ কোরো, কারণ তাদের সাথে তোমাদের নিরাপত্তা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
তাই মদিনায় বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়লে তিনি মিশরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মিশরের সর্বস্তরের মানুষ রাসুলুল্লাহর (সা.) এই বিদুষী নাতনি ও তার পরিবারকে অভূতপূর্ব সম্মান ও আন্তরিকতার সাথে সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করে নেয়।
মিশরে তার শুভ আগমন যেন মিশরবাসীর জন্য বরকত ও রহমতের দুয়ার খুলে দিয়েছিল। তিনি সর্বদা মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়াতেন। মিশরীয়দের জন্য তিনি ছিলেন পরম আশার আশ্রয়স্থল।
একবার মিশরে নীল নদ শুকিয়ে গিয়ে মারাত্মক অনাবৃষ্টি ও খরার সৃষ্টি হলে জনগণ হাহাকার করে তার কাছে দোয়ার আবেদন জানায়। তিনি তখন নিজের মাথার একটি সুতি হিজাব বা ওড়না তাদের হাতে দিয়ে নদীতে ফেলে দিতে বলেন। লোকেরা নদীপ্রান্তে গিয়ে ওড়নাটি পানিতে ফেলার সাথে সাথেই নীল নদের পানি কানায় কানায় ভরে ওঠে এবং খরার ভয়াল থাবা থেকে মিশরবাসী রক্ষা পায়।
তৎকালীন বিখ্যাত ফকিহ ইমাম শাফেঈ (রহ.) মিশরে অবস্থানকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার কাছে লোক পাঠিয়ে দোয়ার আবেদন জানাতেন এবং সাইয়্যেদা নাফিসার (রহ.) দোয়ার বরকতে দ্রুত সুস্থতা লাভ করতেন।
ইবাদত ও আত্মিক সাধনা
অভিজাত সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করা সত্ত্বেও সাইয়্যেদা নাফিসা (রহ.) দুনিয়াবি মোহ ত্যাগ করে আত্মসংযম ও নিভৃত সাধনার পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি বিলাসী খাবার বা পোশাক পরিহার করতেন। কথিত আছে, তিনি তিন দিনে মাত্র একবার অত্যন্ত সামান্য আহার গ্রহণ করতেন। দুই ঈদের দিন এবং তাশরিকের নির্দিষ্ট দিনগুলো ব্যতীত বছরজুড়ে তিনি একটানা নফল রোজা রাখতেন এবং সারা রাত জেগে সিজদা, তাহাজ্জুদ ও কোরআন তিলাওয়াতে কাটিয়ে দিতেন।
তার ভাতিজি যাইনাব, যিনি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তার খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন, তিনি বর্ণনা করেন যে, সাইয়্যেদা নাফিসাকে তিনি কখনো রাতের বেলা ঘুমাতে বা অহেতুক সময় নষ্ট করতে দেখেননি। যাইনাব যখন তাকে নিজের শরীরের ওপর কিছুটা সদয় হওয়ার বা বিশ্রাম নেওয়ার অনুরোধ করতেন, তখন তিনি পরম আকুলতায় কেঁদে উঠে বলতেন, ‘আমি কীভাবে নিজের ওপর শিথিলতা দেখাব? আমার সামনে এমন এক কঠিন ও দীর্ঘ পরকালের পথ রয়েছে, যা কেবল কঠোর সাধকেরাই অতিক্রম করতে পারে।’
সাইয়্যেদা নাফিসা (রহ.) তার ঘরের ভেতরেই নিজের হাতে একটি গভীর কবর খনন করে রেখেছিলেন। তিনি প্রতিদিন সেই কবরের ভেতরে নেমে নামাজ আদায় করতেন এবং কোরআন তিলাওয়াত করতেন। ইন্তেকালের আগে সেই কবরে বসে তিনি একাই সম্পূর্ণ কোরআন এক হাজার বার খতম করার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
ইন্তেকালের পরম মুহূর্ত
২০৮ হিজরির রজব মাসে এই মহীয়সী নারী মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। রোগভোগের দিনগুলোতেও তার ইবাদত ও সাধনায় কোনো ভাটা পড়েনি। রমজান মাস যখন শুরু হলো, তখন তিনি খুবই অসুস্থ। চিকিৎসকরা তার শারীরিক দুর্বলতা দেখে রোজা ভাঙার পরামর্শ দিলে তিনি বলেন, ‘আমি দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে একটানা এই আকুতি জানিয়ে আসছি যেন রোজা রাখা অবস্থায় আমার মৃত্যু হয়। আজ যখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ সামনে এসেছে, তখন আমি কীভাবে রোজা ভেঙে ফেলব?’
অবশেষে ২০৮ হিজরির পবিত্র রমজান মাসে, সুরা আল-আনআম তিলাওয়াতরত অবস্থায় এবং রোজাদার অবস্থায় তিনি মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার ইন্তেকালের পর স্বামী ইসহাক (রহ.) তাকে মদিনায় নিয়ে দাফন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মিশরের সর্বস্তরের মানুষ তাকে মিশরেই দাফন করার অনুরোধ জানালে তিনি সিদ্ধান্ত বদল করেন। নিজ হাতে খোঁড়া সেই পবিত্র কবরেই তাকে সমাহিত করা হয়।
সাইয়্যেদা নাফিসা (রহ.) ছিলেন জ্ঞান, তাকওয়া ও নিখাদ ইমানের এক বাস্তব মূর্তি। বহু শতাব্দি পেরিয়ে আজও তার রেখে যাওয়া আদর্শ ও জীবনকাহিনি সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও মুসলিম নারীদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
সূত্র: আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তারিখে বাগদাদ, তাহজিবুল কামাল