সোমবার
১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোজা অবস্থায় রক্ত বের হলে কি ওজু বা রোজা নষ্ট হয়?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:২৭ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

রোজা অবস্থায় নাক দিয়ে, দাঁত থেকে, কাটা জায়গা থেকে বা শরীরের অন্য কোনো অংশ দিয়ে রক্ত বের হলে অনেকের মনে সন্দেহ হয়—

এতে কি ওজু নষ্ট হয়ে যায়? অথবা রোজা ভেঙে যায় কি না? ইসলামী শরিয়তের আলোকে এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি।

রোজা ভাঙার মূল নীতি

রোজা ভাঙে তখনই, যখন ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু শরীরের ভেতরে (মুখ, নাক বা গলা দিয়ে) প্রবেশ করানো হয় অথবা সহবাসের মাধ্যমে রোজা ভাঙা হয়।

শুধু শরীর থেকে কিছু বের হওয়া—যেমন রক্ত, ঘাম বা ক্ষত থেকে তরল বের হওয়া—এগুলো রোজা ভাঙার কারণ নয়।

আরও পড়ুনঃ রোজা অবস্থায় মিথ্যা কসম খেলে করণীয় কী?

এ বিষয়ে একটি মূলনীতি ফকিহরা উল্লেখ করেছেন:

“রোজা ভাঙে প্রবেশের দ্বারা, বের হওয়ার দ্বারা নয়।” হিজামা (রক্ত বের করা) সংক্রান্ত হাদিস

হজরত ইবন আব্বাস (রা.) বলেন,

“নবী (সা.) রোজা অবস্থায় হিজামা (রক্ত বের করা) করিয়েছেন।” (সহিহ বুখারি)

এই হাদিস স্পষ্ট প্রমাণ করে যে রোজা অবস্থায় শরীর থেকে রক্ত বের হলেও রোজা ভেঙে যায় না।

যদি রক্ত বের হওয়াই রোজা ভাঙার কারণ হতো, তাহলে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে রোজা অবস্থায় হিজামা করতেন না।

তবে অন্য একটি হাদিসে এসেছে,

“হিজামা করানো ব্যক্তি ও হিজামা করা ব্যক্তি উভয়ের রোজা ভেঙে গেল।” (সুনানে আবু দাউদ)

উলামায়ে কেরাম এই দুই হাদিসের সমন্বয় করে বলেন, দ্বিতীয় হাদিসটি দুর্বলতা ও কষ্টের কারণে রোজা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কার দিকে ইঙ্গিত করে,

অথবা তা পরবর্তীতে রহিত (মানসুখ) হয়েছে। অধিকাংশ ফকিহের মত হলো—রক্ত বের হলে রোজা ভাঙে না।

ওজুর ক্ষেত্রে রক্ত বের হওয়া রক্ত বের হলে ওজু নষ্ট হবে কি না—এ বিষয়ে মাজহাবভেদে মতভেদ রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ রোজা রেখে কাউকে গালি দিলে রোজার কী ক্ষতি হয়?

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী,

যদি শরীরের কোনো অংশ থেকে রক্ত বের হয়ে প্রবাহিত হয় (গড়িয়ে পড়ে), তবে ওজু ভেঙে যাবে।

কিন্তু যদি শুধু অল্প রক্ত দেখা যায় এবং তা প্রবাহিত না হয়, তবে ওজু ভাঙবে না। শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি মাজহাব অনুযায়ী,

রক্ত বের হলে সাধারণত ওজু ভাঙে না, যতক্ষণ না তা প্রস্রাব বা পায়খানার রাস্তা দিয়ে বের হয়।

এ বিষয়ে দলিল হিসেবে হাদিস রয়েছে:

হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত,

“এক সাহাবি নামাজরত অবস্থায় আহত হন এবং রক্ত ঝরতে থাকে, তবুও তিনি নামাজ চালিয়ে যান।” (সহিহ বুখারি – অর্থগত বর্ণনা)

এ থেকে বোঝা যায়, শুধু রক্ত বের হওয়া ওজু ভাঙার স্বতন্ত্র কারণ নয় (অন্যান্য মাজহাবের মতে)।

নাক দিয়ে রক্ত পড়লে যদি নাক দিয়ে রক্ত বের হয় এবং তা বাইরে বেরিয়ে যায়, তাহলে রোজা ভাঙবে না। কিন্তু যদি রক্ত গিলে ফেলা হয়,

তাহলে রোজা ভেঙে যাবে, কারণ তা মুখ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছে।

দাঁত থেকে রক্ত বের হলে

দাঁত থেকে রক্ত বের হয়ে বাইরে ফেলে দিলে রোজা ভাঙবে না। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে সেই রক্ত গিলে ফেললে রোজা ভেঙে যাবে।

আরও পড়ুনঃ সেহরির সময় ও আজানের সময়ের পার্থক্য কতটুকু?

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমার উম্মত ভুল, ভুলে যাওয়া ও জবরদস্তির কারণে দায়মুক্ত।” (ইবন মাজাহ)

অতএব অনিচ্ছাকৃতভাবে সামান্য রক্ত গলায় গেলে রোজা নষ্ট হবে না, তবে ইচ্ছাকৃত হলে নষ্ট হবে।

সতর্কতা ও আদব

রোজা অবস্থায় রক্ত বের হলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে পরিষ্কার হয়ে নামাজ ও ইবাদত চালিয়ে যেতে হবে।

যদি দুর্বলতা বা অসুস্থতা দেখা দেয়, তাহলে পরে চিকিৎসা নেওয়া উত্তম।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

“তোমাদের শরীরেরও তোমাদের ওপর হক আছে।” (সহিহ বুখারি)

এ হাদিস প্রমাণ করে, নিজের শরীরের যত্ন নেওয়াও দ্বীনের অংশ।

সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত

রোজা অবস্থায় শরীর থেকে রক্ত বের হলে রোজা ভাঙে না। ইচ্ছাকৃতভাবে রক্ত গিলে ফেললে রোজা ভেঙে যাবে।

ওজু ভাঙা না ভাঙা মাজহাবভেদে ভিন্ন, তবে হানাফি মতে প্রবাহিত রক্তে ওজু ভাঙে। নাক বা দাঁত থেকে রক্ত বের হলে বাইরে ফেলে দিলে রোজা ঠিক থাকবে।

রোজা অবস্থায় রক্ত বের হওয়া সাধারণত রোজা নষ্ট করে না এবং এটি নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। শরিয়তের দৃষ্টিতে রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া ও সংযম অর্জন।

তাই এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য রাখা, পরিষ্কার থাকা এবং ইবাদত চালিয়ে যাওয়া উত্তম।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও সাহাবাদের আমল প্রমাণ করে যে রক্ত বের হওয়া রোজা ভাঙার কারণ নয়, যতক্ষণ না তা ইচ্ছাকৃতভাবে শরীরের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
FIFA World Cup
LIVE
No match data available
World Cup