

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজান মাসে রোজা পালন করতে গিয়ে অনেকের জীবনে এমন পরিস্থিতি আসে, যখন ঘুম থেকে দেরিতে ওঠা, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে সাহরি খাওয়া সম্ভব হয় না। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—সাহরি না খেয়ে রোজা রাখলে কি সেই রোজা সহিহ হবে, নাকি রোজা ভেঙে যাবে বা শুদ্ধ হবে না।
এই বিষয়টি ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সরাসরি রোজার সহিহ হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। কুরআন, সহিহ হাদিস এবং ফিকহি ব্যাখ্যার আলোকে এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি।
ইসলামে রোজার ফরজ হওয়ার মূল শর্ত হলো নিয়ত করা এবং সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার ও সহবাস থেকে বিরত থাকা। সাহরি খাওয়া রোজার ফরজ শর্ত নয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা রোজার বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে সাহরি খাওয়াকে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেননি।
বরং তিনি বলেছেন, “আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না ভোরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, তারপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৭)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সাহরি খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা রোজা সহিহ হওয়ার আবশ্যিক শর্ত নয়।
আরও পড়ুনঃ ওজন কমাতে রোজার মাসে ডায়েট প্ল্যান কেমন হওয়া উচিত?
হাদিসে সাহরির গুরুত্ব ও ফজিলত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা সাহরি খাও, কেননা সাহরিতে বরকত রয়েছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯২৩)। এই হাদিস সাহরির গুরুত্ব প্রমাণ করে, কিন্তু এখানে সাহরি না খেলে রোজা হবে না—এমন কোনো কথা বলা হয়নি।
বরং আলেমরা একমত যে, সাহরি খাওয়া সুন্নত, ফরজ নয়। তাই সাহরি না খেলেও রোজা শুদ্ধ হয়। ফিকহবিদদের মতে, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে সাহরি না খেয়ে সুবহে সাদিকের আগে রোজার নিয়ত করে নেয়, তাহলে তার রোজা সম্পূর্ণ সহিহ হবে।
এমনকি কেউ যদি ফজরের পর ঘুম থেকে উঠে জানতে পারেন যে তিনি সাহরি খাননি, তবুও যদি তিনি দিনের বেলায় কিছু না খান ও না পান করেন, তাহলে সেই রোজা ভেঙে যাবে না। কারণ রোজার মূল বিষয় সাহরি নয়, বরং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পানাহার থেকে বিরত থাকা।
আরও পড়ুনঃ সেহরির শেষ সময়ের কতক্ষণ পর পর্যন্ত খাওয়া জায়েজ?
তবে সাহরি না খাওয়ার কিছু বাস্তব দিক রয়েছে, যেগুলো বিবেচনায় রাখা জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সাহরি না খেলে শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে, পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে এবং দিনের বেলায় মাথা ঘোরা, ক্লান্তি বা রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
বিশেষ করে যারা শারীরিক পরিশ্রম করেন, অসুস্থ, গ্যাস্ট্রিকের রোগী বা ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাদের জন্য সাহরি না খেয়ে রোজা রাখা কষ্টকর ও কখনও কখনও ক্ষতিকর হতে পারে। ইসলাম কখনোই এমন ইবাদতের নির্দেশ দেয় না, যা মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯৫)।
তাই কেউ যদি সাহরি না খাওয়ার কারণে মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়েন বা অসুস্থ হয়ে যান, তাহলে তার জন্য রোজা ভেঙে ফেলা জায়েজ এবং পরে সেই রোজা কাজা করা শরিয়তসম্মত। এতে কোনো গুনাহ নেই।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়ত। সাহরি না খেলেও যদি কেউ ফজরের আগে মনে মনে রোজার নিয়ত করেন, তাহলে তার রোজা সহিহ হবে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, রমজানের রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের আগ থেকে দ্বিপ্রহর পর্যন্ত করা যায়, যদি এর মধ্যে রোজা ভঙ্গকারী কোনো কাজ না করা হয়। তাই সাহরি না খেলেও নিয়ত থাকলে রোজা আদায় হয়ে যায়।
আরও পড়ুনঃ ইফতারের সময় আজান না শুনে ঘড়ি দেখে ইফতার করা যাবে কি?
সবশেষে স্পষ্টভাবে বলা যায়, সাহরি না খেয়ে রোজা রাখলে রোজা সহিহ হয় এবং এতে কোনো সমস্যা নেই। সাহরি রোজার শর্ত নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে সাহরি বাদ দেওয়া উত্তম নয়, কারণ এতে সাহরির বরকত থেকে বঞ্চিত হতে হয় এবং শরীর দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সুতরাং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং ফিকহি ব্যাখ্যার আলোকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—সাহরি না খেয়ে রোজা রাখা জায়েজ এবং রোজা শুদ্ধ হয়। তবে সুন্নতের অনুসরণ এবং শরীরের সুস্থতার জন্য নিয়মিত সাহরি খাওয়াই উত্তম ও অধিক ফজিলতপূর্ণ।
মন্তব্য করুন

