সোমবার
১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইফতারের সময় আজান না শুনে ঘড়ি দেখে ইফতার করা যাবে কি?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

রমজান মাসে রোজা পালনের ক্ষেত্রে সময়ের সঠিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেহরি ও ইফতারের সময় নিয়ে সামান্য ভুলও রোজার সহিহ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। আধুনিক সময়ে অনেকেই আজানের অপেক্ষা না করে ঘড়ি, মোবাইল ফোন বা রমজানের ক্যালেন্ডার দেখে ইফতার করেন।

এতে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—আজান না শুনে শুধু সময় দেখে ইফতার করা কি জায়েজ, নাকি এতে রোজা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই বিষয়টি কুরআন, সহিহ হাদিস এবং ফিকহি মূলনীতির আলোকে পরিষ্কারভাবে জানা প্রয়োজন।

ইসলামে রোজা ভাঙার সময় নির্ধারিত হয়েছে সূর্যাস্তের সঙ্গে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তারপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৭)। আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এখানে ‘রাত শুরু হওয়া’ বলতে সূর্য সম্পূর্ণভাবে অস্ত যাওয়া বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সূর্য ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইফতারের সময় শুরু হয়। আজান হলো সেই সময়ের ঘোষণা মাত্র, আজান নিজে ইফতারের শর্ত নয়।

আরও পড়ুনঃ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থাকলে রোজা রাখার ডায়েট চার্ট।

হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইফতার দ্রুত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “মানুষ ততক্ষণ কল্যাণের ওপর থাকবে, যতক্ষণ তারা ইফতার তাড়াতাড়ি করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৫৭)। এই হাদিস প্রমাণ করে যে, সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করা সুন্নত। এখানে আজান শোনাকে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, বরং সময় নিশ্চিত হওয়াকেই মূল বিষয় হিসেবে ধরা হয়েছে।

ফিকহের দৃষ্টিতে ইফতারের জন্য শর্ত হলো সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়া। যদি কেউ নির্ভরযোগ্য উপায়ে নিশ্চিত হন যে সূর্য ডুবে গেছে, তাহলে আজান না শুনলেও ইফতার করা জায়েজ। নির্ভরযোগ্য উপায়ের মধ্যে রয়েছে সঠিক সময়সূচি, বিশ্বস্ত ক্যালেন্ডার, নির্ভুল ঘড়ি বা বিশ্বস্ত মোবাইল অ্যাপ। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, যেখানে চারপাশে অনেক মসজিদ থাকলেও সব আজান একসঙ্গে শোনা যায় না, সেখানে সময় দেখে ইফতার করা একটি সাধারণ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।

অনেক সময় দেখা যায়, আজান কিছুটা দেরিতে দেওয়া হয় অথবা শব্দ দূষণ, দূরত্ব বা অন্য কোনো কারণে আজান শোনা যায় না। এই অবস্থায় আজানের অপেক্ষায় থাকলে ইফতার অযথা বিলম্বিত হয়ে যায়, যা সুন্নতের পরিপন্থী। আলেমরা বলেছেন, আজান শোনা না গেলে বা আজান দেরিতে হলে নির্ভরযোগ্য সময় অনুযায়ী ইফতার করাই উত্তম। কারণ শরিয়তের বিধান সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, আজানের সঙ্গে নয়।

আরও পড়ুনঃ ওজন কমাতে রোজার মাসে ডায়েট প্ল্যান কেমন হওয়া উচিত?

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। যদি কেউ আজান না শুনে বা সময় যাচাই না করে আন্দাজের ওপর ইফতার করেন এবং পরে জানা যায় যে সূর্য তখনও অস্ত যায়নি, তাহলে সেই রোজা ভেঙে যাবে এবং কাজা আদায় করতে হবে। তাই শুধু ঘড়ি দেখলেই হবে না, সেই ঘড়ি বা সময়সূচির নির্ভুলতা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সন্দেহ থাকলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করাই নিরাপদ পদ্ধতি।

ইসলামে সন্দেহ থেকে বাঁচার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে তা ছেড়ে দাও এবং যা সন্দেহমুক্ত তা গ্রহণ করো।” (সুনানে তিরমিজি)। এই হাদিসের আলোকে আলেমরা পরামর্শ দেন, যদি সময় নিয়ে সামান্যও সন্দেহ থাকে, তাহলে এক-দুই মিনিট দেরিতে ইফতার করা উত্তম। এতে রোজা ভাঙার ঝুঁকি থাকে না এবং সুন্নতও নষ্ট হয় না।

আরও পড়ুনঃ সেহরির শেষ সময়ের কতক্ষণ পর পর্যন্ত খাওয়া জায়েজ?

আধুনিক যুগে মোবাইল অ্যাপ, ডিজিটাল ঘড়ি ও নির্ভরযোগ্য ইসলামি ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে ইফতারের সঠিক সময় জানা সহজ হয়েছে। এসব মাধ্যমে প্রদত্ত সময় সাধারণত সূর্যাস্তের হিসাব অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। তাই এসব নির্ভরযোগ্য উৎস অনুসরণ করে আজান না শুনেও ইফতার করা জায়েজ এবং শরিয়তসম্মত।

সবশেষে বলা যায়, ইফতারের জন্য আজান শোনা ফরজ বা শর্ত নয়। মূল শর্ত হলো সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়া। নির্ভরযোগ্য ঘড়ি, ক্যালেন্ডার বা সময়সূচি দেখে যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে সূর্য ডুবে গেছে, তাহলে আজান না শুনলেও ইফতার করা জায়েজ। তবে সময় নিয়ে সন্দেহ থাকলে সতর্কতার সঙ্গে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করাই উত্তম। এভাবে ইফতার করলে রোজা সহিহ থাকবে এবং সুন্নতের অনুসরণও সঠিকভাবে আদায় হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X