শুক্রবার
১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার নিয়ম ও ডাক্তারি সতর্কতা

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম
এনপিবি গ্রাফিক্স
expand
এনপিবি গ্রাফিক্স

রমজান মাসে রোজা পালন করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। তবে গর্ভাবস্থায় থাকা নারীদের ক্ষেত্রে রোজা রাখা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়।

কারণ এই সময় একজন নারীর শরীর শুধু নিজের জন্য নয়, অনাগত সন্তানের সুস্থতার জন্যও দায়িত্ব বহন করে। তাই গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার বিষয়টি ইসলামি বিধান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে সঠিকভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি।

ইসলামে গর্ভবতী নারীদের জন্য রোজার বিষয়ে বিশেষ সহজীকরণ রাখা হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে সে পরে অন্য দিনে সেই সংখ্যা পূরণ করবে।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫)। গর্ভাবস্থা সরাসরি অসুস্থতা না হলেও, যদি রোজা রাখার কারণে মা বা গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা অসুস্থতার পর্যায়ে গণ্য হয়।

এ কারণে অধিকাংশ ফিকহবিদ একমত যে, গর্ভবতী নারী যদি নিজের বা সন্তানের জন্য ক্ষতির আশঙ্কা করেন, তবে তার জন্য রোজা না রাখা জায়েজ।

হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীদের জন্য রোজা ভাঙার অনুমতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুসাফিরের কাছ থেকে রোজা অর্ধেক নামাজ মাফ করেছেন এবং গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীর কাছ থেকেও রোজা মাফ করেছেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭১৫)। এই হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা বাধ্যতামূলক নয় যদি তাতে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

তবে সব গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে রোজা রাখা নিষিদ্ধ নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখা যায়, অনেক নারী সুস্থ গর্ভাবস্থায় রোজা রাখতে সক্ষম হন, বিশেষ করে গর্ভধারণের মাঝামাঝি সময়ে।

এজন্য রোজা রাখার আগে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। চিকিৎসক সাধারণত নারীর বয়স, গর্ভের বয়স, রক্তস্বল্পতা, ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, পূর্ববর্তী গর্ভধারণের ইতিহাস এবং বর্তমান শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন।

ডাক্তাররা সাধারণত সতর্ক করেন যে, গর্ভাবস্থায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে পানিশূন্যতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এবং কখনও কখনও শিশুর বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়তে পারে।

তাই যারা রোজা রাখতে চান, তাদের সেহরি ও ইফতারে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পানি পান করা, প্রোটিন, শাকসবজি, ফলমূল এবং জটিল কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করা গর্ভবতী মায়ের জন্য প্রয়োজনীয়।

রোজা রাখার সময় যদি গর্ভবতী নারী অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমি ভাব, তীব্র পিপাসা, পেট ব্যথা বা শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ অনুভব করেন, তাহলে দেরি না করে রোজা ভেঙে ফেলা উচিত। শরিয়তের দৃষ্টিতে এতে কোনো গুনাহ নেই।

বরং নিজের ও সন্তানের জীবন রক্ষা করা ফরজের অন্তর্ভুক্ত। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯৫)।

ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে, গর্ভবতী নারী যদি রোজা না রাখেন, তাহলে পরবর্তীতে সুস্থ অবস্থায় সেই রোজাগুলো কাজা আদায় করতে হবে। অধিকাংশ আলেমের মতে, শুধুমাত্র সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কায় রোজা না রাখলে কাজার পাশাপাশি ফিদইয়া দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে এই বিষয়ে মাজহাবভেদে মতভেদ রয়েছে, তাই ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী আলেমের সঙ্গে পরামর্শ করা উত্তম।

সবশেষে বলা যায়, গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা বা না রাখা সম্পূর্ণভাবে মায়ের শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর নির্ভর করে। ইসলাম কখনোই গর্ভবতী নারীকে নিজের বা সন্তানের ক্ষতি করে রোজা রাখতে বাধ্য করেনি। বরং শরিয়ত সহজ, মানবিক এবং কল্যাণকামী বিধান দিয়েছে।

সুতরাং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং ডাক্তারি সতর্কতার আলোকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়- গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা জায়েজ, যদি তাতে মা ও সন্তানের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে। আর যদি ঝুঁকি থাকে, তাহলে রোজা না রেখে পরে কাজা আদায় করাই শরিয়তসম্মত ও নিরাপদ পদ্ধতি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন