শনিবার
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইনহেলার ব্যবহার করলে কি রোজা ভেঙে যায়?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:২২ পিএম
expand
ইনহেলার ব্যবহার করলে কি রোজা ভেঙে যায়?

রমজান মাসে রোজা পালন করা শুধু খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকা নয়, বরং স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নেওয়া ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক রোজাদারকে শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণে দিনে ইনহেলার ব্যবহার করতে হয়। তখনই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে—দিনের বেলায় ইনহেলার ব্যবহার করলে কি রোজা ভেঙে যায়, নাকি রোজা সহিহ থাকে।

ইসলামি শরিয়তে রোজা ভাঙার মূল কারণ হলো ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য, পানীয় বা যৌন মিলন গ্রহণ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আর যারা অসুস্থ বা সফরে থাকে, তারা পরে সেই সংখ্যক রোজা পূর্ণ করবে।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫)। অর্থাৎ রোজা ভাঙার ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইচ্ছাকৃত কাজ। অনিচ্ছাকৃত বা চিকিৎসাজনিত কোনো কাজের জন্য রোজা ভাঙে না।

ইনহেলার ব্যবহারের বিষয়ে ফিকহগণ একমত যে, এটি রোজার ওপর প্রভাব ফেলে না। কারণ ইনহেলার সাধারণত ফুসফুসে বা শ্বাসনালীতে সরাসরি যায় এবং এটি খাদ্য বা পানীয় হিসেবে গণ্য হয় না। হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি—চার মাজহাবের আলেমরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, চিকিৎসার প্রয়োজনে ইনহেলার ব্যবহার রোজা ভাঙে না। ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া ও রাদ্দুল মুহতার গ্রন্থে উল্লেখ আছে, যে কোনো শারীরিক চিকিৎসার জন্য ইনহেলার বা অ্যান্টি-অ্যাজমা স্প্রে ব্যবহার করা জায়েজ এবং এতে রোজা ক্ষতি হয় না।

আরও পড়ুন ঃ দিনের বেলা সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার করলে রোজার ক্ষতি হবে কি?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থদের চিকিৎসা গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন। সহিহ হাদিসে এসেছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মরীচিকে চিকিৎসা গ্রহণ করতে দেওয়া হয়েছে, আর আল্লাহ তা দ্বারা পূর্ণ ক্ষমা দেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭১৬) এই প্রেক্ষাপটে চিকিৎসাজনিত ইনহেলার ব্যবহার রোজা ভাঙার অন্তর্ভুক্ত নয়।

কিছু মানুষ ভেবে থাকেন যে, ইনহেলার ব্যবহার করলে খাবার বা পানি শরীরের মধ্যে প্রবেশ করছে, তাই রোজা ভেঙে যাবে। কিন্তু ফিকহগণ এটিকে স্বাভাবিকভাবে গলার ভেতরে খাদ্য বা পানীয় হিসেবে গণ্য করেন না। কারণ এটি সরাসরি পেটে পৌঁছায় না এবং খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ইনহেলার সাধারণত তুচ্ছ তরল বা ঔষধীয় কণা নিয়ে কাজ করে, যা রোজার ভিত্তিতে কোনো প্রভাব ফেলে না।

আরও পড়ুন ঃ দাঁত ব্রাশ বা পেস্ট ব্যবহার করলে কি রোজা মাকরুহ হয়?

তবে সতর্কতার জন্য কিছু শর্ত রাখা হয়েছে। যদি কেউ ইনহেলার ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃতভাবে শ্বাসের মাধ্যমে বেশি তরল বা খাবার মুখে বা গলায় প্রবেশ করায়, তখন সেই ক্ষেত্রে আলেমরা পরামর্শ দিয়েছেন অতিরিক্ত সতর্ক থাকা। কিন্তু সাধারণ চিকিৎসাজনিত ব্যবহার, যেমন অ্যাজমা বা ব্রংকাইটিসের জন্য ইনহেলার ব্যবহার, রোজা ভাঙে না।

আরও পড়ুন ঃ রোজা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে কি রোজা ভেঙে যায়?

ফিকহি আলোকে এটিও বলা হয়েছে যে, রোজার উদ্দেশ্য হলো শারীরিক ও আত্মিক নিয়ন্ত্রণ। ইনহেলার ব্যবহার মানবদেহের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বজায় রাখে এবং জীবনধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে মানুষকে স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখতে উৎসাহিত করা হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, “আর তোমরা তোমার প্রাণ রক্ষা করো।” (সুরা আল-মাইদাহ, আয়াত: ৩)। এটি রোজা চলাকালীন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণকেও সমর্থন করে।

সবশেষে বলা যায়, রোজা অবস্থায় দিনে ইনহেলার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং জায়েজ। এতে রোজা ভাঙে না, সওয়াব কমে না, এবং রোজাদার তার স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নিতে পারে। শরিয়তের নির্দেশনা স্পষ্টভাবে এই ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, কারণ এটি অনিচ্ছাকৃত এবং চিকিৎসাজনিত ব্যবহারের আওতায় পড়ে।

সুতরাং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি গ্রন্থের আলোকে বলা যায়—রোজা অবস্থায় ইনহেলার ব্যবহার করলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। এটি রোজাদারের জন্য অনুমোদিত, মানবিক এবং শরিয়ত সম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X