বুধবার
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বুধবার
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রমজানের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত: আল্লাহর অশেষ রহমত পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

পবিত্র মাহে রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়, এটি আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সময়। বছরের বারোটি মাসের মধ্যে রমজানকে বলা হয় ‘সৈয়দুশ শুহুর’ বা সকল মাসের সরদার। এই মাসটিকে মহান আল্লাহ তিনটি বিশেষ ভাগে বিভক্ত করেছেন।

যার প্রথম ১০ দিন হলো ‘রহমতের দশক’। একজন মুমিন মুসলমানের জন্য এই ১০ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়েই মহান আল্লাহর দয়া ও করুণার বারিধারা সবচেয়ে বেশি বর্ষিত হয়।

আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা এই দশকের ফজিলত ও গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। রহমতের দশকের তাৎপর্য

রমজানের প্রথম ১০ দিনকে রহমতের দশক বলা হয় কারণ এই সময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ দয়া প্রদর্শন করেন। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, "রমজানের প্রথম ১০ দিন রহমতের।" (সহিহ ইবনে খুজাইমা)। রহমত মানে হলো আল্লাহর করুণা বা দয়া।

সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহ দয়ালু, কিন্তু রমজানের এই নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর দয়ার দরজাগুলো বিশেষভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

মানুষ জন্মগতভাবে ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নয়। সারা বছরের পাপের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হতে এবং পুনরায় আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয় এই ১০ দিন।

এই রহমতের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী ২০ দিনের মাগফিরাত ও নাজাত নির্ভর করে। অর্থাৎ, আপনি যদি প্রথম ১০ দিনে আল্লাহর দয়া লাভ করতে পারেন, তবে আপনার জন্য গুনাহ মাফ করানো এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে।

হাদিসের আলোকে প্রথম ১০ দিনের ফজিলত

ইসলামি শরিয়তে রমজানের ফজিলত নিয়ে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। রহমতের এই দশকে আল্লাহর বিশেষ কিছু অনুগ্রহের কথা হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। জান্নাতের দুয়ার উন্মুক্ত হওয়া

রমজানের প্রথম রাত থেকেই আকাশের দরজা এবং জান্নাতের সব কটি দরজা খুলে দেওয়া হয়। এটি মূলত আল্লাহর রহমতেরই বহিঃপ্রকাশ।

এর মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, বান্দা যেন নেক আমলের মাধ্যমে জান্নাতে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করে। একই সাথে জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বড় বড় শয়তানদের বন্দি করা হয়, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে আল্লাহর রহমত কুড়াতে পারে।

দোয়া কবুলের অনন্য সময়

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, "রোজা কেবল আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।"

প্রথম ১০ দিনে রোজাদার যখন আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে রহমত ভিক্ষা করে, তখন আল্লাহ তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জা বোধ করেন। বিশেষ করে ইফতারের আগমুহূর্তে আল্লাহর রহমত লাভ করার দোয়াগুলো দ্রুত কবুল হয়।

কেন এই রহমত আমাদের জন্য অপরিহার্য?

আমরা প্রতিদিন অসংখ্য ছোট-বড় পাপ করি। এই পাপের কারণে আমাদের অন্তর কালো হয়ে যায় এবং আমরা আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যাই। রমজানের এই প্রথম ১০ দিন আমাদের অন্তরের সেই জং দূর করার মোক্ষম সময়। এই ১০ দিনকে আধ্যাত্মিক বসন্তকাল বলা যেতে পারে।

যেমন বসন্তে প্রকৃতি নতুন রূপে সেজে ওঠে, তেমনি রহমতের দশকে ইবাদতের মাধ্যমে একজন মুমিনের ঈমানি শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়।

আল্লাহর রহমত ছাড়া কোনো বান্দার পক্ষেই জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়। এমনকি আমল দিয়েও কেউ জান্নাত নিশ্চিত করতে পারবে না যদি না আল্লাহর রহমত তার সাথী হয়। তাই এই ১০ দিন মূলত আল্লাহর সেই বিশেষ 'রহমত' বা করুণা চেয়ে নেওয়ার জন্য নির্ধারিত।

রহমত লাভের প্রধান শর্তসমূহ

আল্লাহর রহমত কেবল দাবি করলেই পাওয়া যায় না, এর জন্য কিছু গুণ অর্জন করতে হয়। যারা কেবল না খেয়ে থাকেন কিন্তু আচরণের পরিবর্তন আনেন না, তাদের জন্য রহমত পাওয়া কঠিন।

ইখলাস বা আন্তরিকতা: আপনি যে আমলই করুন না কেন, তা হতে হবে খাঁটিভাবে আল্লাহর জন্য। লোকদেখানো ইবাদতে রহমত পাওয়া যায় না।

হালাল রিজিক: রহমতের এই দিনে সেহরি ও ইফতার অবশ্যই হালাল উপার্জনে হতে হবে। হারাম খাবারে পুষ্ট শরীর ইবাদতে তৃপ্তি পায় না এবং দোয়াও কবুল হয় না।

তওবা ও অনুশোচনা: অতীতের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে পাপে না জড়ানোর অঙ্গীকার করা আল্লাহর রহমত পাওয়ার চাবিকাঠি।

রহমতের দশকে সলফে সালেহীনদের আদর্শ

সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীরা রমজানের প্রথম ১০ দিন এলে অন্য সময়ের তুলনায় ইবাদত অনেক বাড়িয়ে দিতেন। তারা এই ১০ দিনকে আল্লাহর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গভীর করার সময় মনে করতেন।

অনেকে এ সময়ে মানুষের সাথে কথা কমিয়ে দিয়ে তিলাওয়াত ও জিকিরে মগ্ন থাকতেন। তাদের এই একাগ্রতা আমাদের জন্য অনুকরণীয়।

রমজানের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি বিশেষ বোনাস।

আমরা যদি এই ১০ দিনকে অবহেলায় কাটিয়ে দেই, তবে আমরা অনেক বড় নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হব। তাই আসুন, প্রথম দিন থেকেই আল্লাহর রহমত পাওয়ার ব্যাকুলতা নিয়ে সিয়াম সাধনায় আত্মনিয়োগ করি।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. রমজানের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্ব কী?

রমজানের প্রথম ১০ দিন মূলত আল্লাহর রহমত বা করুণার সময়। এই সময়ে বান্দার ওপর আল্লাহর অসীম দয়া নাজিল হয়, যা তাকে পরবর্তী মাসগুলোতে নেক কাজ করার শক্তি জোগায়।

২. রহমতের দশকের বিশেষ দোয়া কোনটি?

রহমতের দশকের একটি বিশেষ দোয়া হলো: 'রাব্বিগফির ওয়ারহাম ওয়া আনতা খইরুর রহিমিন' (হে প্রভু! আমাকে ক্ষমা করুন ও দয়া করুন, আপনিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু)।

৩. এই ১০ দিনে কি কোনো বিশেষ নফল নামাজ আছে?

ইসলামে এই ১০ দিনের জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট নফল নামাজ নেই। তবে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পাশাপাশি তারাবিহ, তাহাজ্জুদ এবং বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া অনেক সওয়াবের কাজ।

৪. পিরিয়ড চলাকালীন মহিলারা কীভাবে ফজিলত পেতে পারেন?

পিরিয়ড চলাকালীন নামাজ ও রোজা না রাখলেও মহিলারা মুখে জিকির, ইস্তিগফার এবং বেশি বেশি দান-সদকা করতে পারেন। এছাড়া রোজাদারদের সেবা করার মাধ্যমেও তারা আল্লাহর রহমত লাভ করতে পারেন।

৫. রহমতের দশকে কুরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব কতটুকু?

যেহেতু রমজান মাসেই কুরআন নাজিল হয়েছে, তাই এই রহমতের দশকে কুরআন তিলাওয়াত করা এবং এর অর্থ বুঝা আল্লাহর রহমত পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X