

প্রথম তিন দিনের বাছাইয়ে বিএনপির ৩, জামায়াতে ইসলামীর ৬ প্রার্থীসহ ৪১১ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
বাতিল হওয়া প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিএনপির প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও জামায়াত ও এনসিপির অভিযোগ, কর্মকর্তারা একটি দলের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। সে কারণে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হওয়ার মতো ঠুনকো কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল হচ্ছে।
তবে ইসি আশ্বস্ত করেছে, বেআইনিভাবে কারও মনোনয়নপত্র বাতিল হলে তা আপিলে পুনর্বহাল হবে। যদি কোনো রিটার্নিং কর্মকর্তা আইন অমান্য করে প্রার্থিতা বাতিল করে থাকেন, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রোববার (৪ জানুয়ারি) বাছাইয়ের শেষ দিন। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া প্রার্থীরা আগামীকাল সোমবার থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করতে পারবেন।
ইসি গতকাল শনিবার বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আপিলের জন্য কমিশন বরাবর আবেদন করতে হবে। মনোনয়নপত্রের মূল কপিসহ সাত কপি দিতে হবে। নির্দিষ্ট বিভাগীয় বুথে আবেদন করতে হবে। ইসিতে আপিলে না টিকলে, প্রার্থীরা উচ্চ আদালতে যেতে পারবেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ঢাকায় ৭৪ এবং অন্য জেলায় ৩৩৭ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
এর বড় সংখ্যকই স্বতন্ত্র। তাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গরমিল থাকায়। ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চাওয়া ডা. তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ভোটারের সই যাচাইয়ে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় জানিয়েছে, ১০ জন ভোটারের সই যাচাই করে দেখা গেছে, একজন এখনও শরীয়তপুরের ভোটার এবং অন্যজন ঢাকা-১১ আসনের ভোটার।
আপিল করার কথা জানিয়ে তাসনিম জারা বলেন, একজন ভোটার শরীয়তপুর থেকে ঢাকা-৯ আসনে স্থানান্তর হয়েছে। এ তথ্য নির্বাচন কমিশনের তালিকায় হালনাগাদ করা হয়নি।
আরেকজন ভোটারের ঠিকানা ঢাকা-৯ আসনের মধ্যে হলেও তিনি তালিকায় ঢাকা-১১ আসনের ভোটার। ইসির কাছে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় এই বিভ্রান্তি হয়েছে।
মনোনয়নপত্র বাতিল নিয়ে প্রার্থী ও দলগুলোর অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, আইনের বাইরে কোথাও কারও মনোনয়নপত্র বাতিল করার সুযোগ নেই।
যা কিছু করা হয়েছে নিয়ম মেনেই। যাদের বাতিল হয়েছে, তাদের আপিল করতে হবে। আপিলে যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারলে ফিরে পাবেন তাদের প্রার্থিতা।
গাইবান্ধার একটি আসনে জামায়াতের প্রার্থী এমপিওভুক্ত স্কুলের শিক্ষক হওয়ায় তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
অন্য আসনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এমন ভিন্ন অবস্থান নিয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা অংশ নিতে পারবেন নির্বাচনে। তাই এই কারণে যাদেরটা বাতিল হয়েছে, তারাও আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পাবেন।
বিএনপির ৩ প্রার্থী বাতিল
মামলাবিষয়ক পূর্ণাঙ্গ তথ্য না দেওয়ায় ময়মনসিংহ-৬ আসনের প্রার্থী ডা. মাহবুবুর রহমান লিটনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
শেরপুর-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ফাহিম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে। তিনি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন- এমন নথি মনোনয়নপত্রের সঙ্গে না দেওয়ার কারণে বাতিল করা হয়েছে।
যশোর-৪ আসনে প্রথমে বিএনপির মনোনয়ন পান টি এস আইয়ুব। বিকল্প হিসেবে অভয়নগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মতিয়ার রহমান ফারাজীকেও মনোনয়ন দেয় দলটি।
বাছাইয়ে টি এস আইয়ুব বাদ পড়েছেন ঋণখেলাপি হওয়ায়। ফারাজীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে আইয়ুব শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকতে নাও পারলে, যশোর-৪ আসন ধানের শীষশূন্য থাকবে না।
বরিশাল-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরফুদ্দিন সান্টুর মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়েছে। আজ রোববার বাছাইয়ে তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
জামায়াতের ৬ জন বাতিল
গাইবান্ধা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাজেদুর রহমানের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে এমপিওভুক্ত শিক্ষক হওয়ায়।
তিনি যে কলেজের শিক্ষক, সেটি জাতীয়করণ হলেও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাজেদুর এমপিওভুক্ত। তাঁর চাকরি জাতীয়করণ হয়নি। অন্য জেলায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে।
যশোর-২ আসনে জামায়াত প্রার্থী ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ক্রেডিট কার্ডে কিস্তি খেলাপের কারণে। তাঁর দাবি, ২০ বছর আগের এই বকেয়া তিনি পরিশোধ করেছেন।
প্রস্তাবক ও সমর্থকের সই নিজে দেওয়ার অভিযোগে জামালপুর-৩ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মুজিবর রহমান আজাদীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
ঢাকা-২ আসনের কর্নেল (অব.) আবদুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে খেলাপি ঋণে। যদিও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সংগঠন রাওয়ার এই সভাপতির দাবি, যে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণের কথা হচ্ছে, তা তিনি ত্যাগ করেছেন ১২ বছর আগে।
কুমিল্লা-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী ইউসুফ সোহেলের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে হলফনামায় পূর্ণাঙ্গ তথ্য না দেওয়ায়।
কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে মামলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য না দেওয়ায়।
তিনি পক্ষপাতের অভিযোগ করে বলেন, প্রার্থিতা বাতিলের সময় সরকারি কর্মকর্তারা হাততালি দিয়ে উল্লাস করেছেন! তারা কী করে নিরপেক্ষ হতে পারে।
জামায়াতের এই সাবেক এমপি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে অবমাননার মামলায় ২০১৩ সালে তিন মাসের সাজা পান। সেই কারাদণ্ড তিনি ওই বছরই ভোগ করেন। ২০১৮ সালে নির্বাচনও করেন। এবার তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কিনা- এ তথ্য না দেওয়ায় কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাহবুব সালেহীর মনোনয়নপত্র স্থগিত করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
ঢাকা-১৮ আসনের প্রার্থী আশরাফুল হকের মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়েছে আয়কর রিটার্নে সঠিক তথ্য না থাকায়।
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থী না দিয়ে আসনটি ছেড়ে দেয় বাংলাদেশ খেলাফতের নুর হোসাইন নুরানীকে। তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
এনসিপির দুটি স্থগিত
এবারের নির্বাচনে এনসিপিকে ৩০ আসন ছাড়ছে জামায়াত। এর মধ্যে সিলেট-১ ও সিলেট-৪ আসন রয়েছে। দুটি আসনেই এনসিপি প্রার্থীর মনোনয়নপত্র স্থগিত হয়েছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের তথ্য না থাকায়।
এসব আসনের প্রার্থীরা প্রার্থিতা ফিরে না পেলে, জামায়াত জোটের শেষ পর্যন্ত কয়েকটি আসনে প্রার্থীই থাকবে না।
যদিও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, ঠুনকো কারণে এসব মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। আপিলে সব টিকবে। ফলে আসন শূন্য থাকার শঙ্কা নেই।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, ইসির কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জেলা প্রশাসকরা বিএনপির দিকে ঝুঁকে রয়েছেন। কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি ঋণখেলাপি। এই তথ্য দেওয়ার পরও রিটার্নিং কর্মকর্তা মনোনয়নপত্র বাতিল করেননি।
কোন জেলায় কত বাতিল
বিভিন্ন প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, গাজীপুরে ১৯, ময়মনসিংহে ১১, রাজশাহীতে ১৯, রংপুরে ১২, মৌলভীবাজারে ৫, শরীয়তপুরে ১০, সিরাজগঞ্জে ৬, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩, ফরিদপুরে ৫, হবিগঞ্জে ১০, জয়পুরহাটে ৭, রাজবাড়ীতে ৫, ঝালকাঠিতে ৯, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৭, ঝিনাইদহে ৪, পাবনায় ৪, সাতক্ষীরায় ১০, সুনামগঞ্জে ১৩, কক্সবাজারে ৫, কিশোরগঞ্জে ১০, ভোলায় ৩, বগুড়ায় ৫, চাঁদপুরে ১৭, কক্সবাজারে ৫, চট্টগ্রামে ১, কুমিল্লায় ৩১, জামালপুরে ১২, মেহেরপুরে ৬, নেত্রকোনায় ৫, নোয়াখালীতে ১৫, পঞ্চগড়ে ৭, টাঙ্গাইলে ১৯, বাগেরহাটে ৫ এবং মাগুরায় ৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন