


রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষতমাসীন দল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজনীতির মাঠের বর্ষীয়ান এ ব্যক্তিত্বের পেশা ছিলো শিক্ষকতা। ছাত্র-ছাত্রী আর ক্লাসরুমের ডায়াস ছেড়ে তিনি আসেন রাজপথে। সেখান থেকে সাংসদ। প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। এখন তিনি বাংলাদেশের ২৩তম ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি’ হওয়ার পথে।
ঠাকুরগাঁওয়ের পৌর চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য, বিএনপির মহাসচিব, মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়া—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি যেমন মাঠের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি বিরোধী দলের আন্দোলন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও সামলেছেন। ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে উঠে আসা এই নেতার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই নানা ঘটনা ও পরিবর্তনের সাক্ষী।
মির্জা ফখরুল ১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন। ওই সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে উঠে আসেন এবং ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের তুঙ্গে ওঠার সময়, মির্জা আলমগীর সংগঠনের মর্যাদাপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। রাজনৈতিক কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাগারে পাঠানো হয়।
শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৭২ সালে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি চাকরিতে থাকাকালে ১৯৭৯ সালের দিকে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর একান্ত সচিব হিসেবেও কাজ করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে তিনি নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে দেশব্যাপী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিতে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।
বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে করতে মির্জা ফখরুল দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে ও পরে তিনি জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
মির্জা ফখরুল প্রথমবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ওই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। প্রায় পাঁচ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন এবং দলীয় বক্তব্যে তিনি অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তিনি দলটির শীর্ষ সাংগঠনিক দায়িত্বে রয়েছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতার সময় এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডন অবস্থানের সময়ে দেশে থেকে বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
বিএনপির পক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় মির্জা ফখরুল একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণের মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরেও তাঁকে আটক করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অংশ বিরোধী দলের কর্মসূচি ও সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
রাজনৈতিক জীবনে অন্তত সাড়ে ৪শ দিন করা বরণ করেছেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্যক্তিগত জীবনে রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে ঢাকায় একটি বীমা কোম্পানিতে কর্মরত। এই দম্পতির দুই কন্যা, মির্জা শামারুহ এবং মির্জা সাফারুহ। শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং এই প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো। কনিষ্ঠ কন্যা মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকার একটি স্বনামধন্য স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।